Posts

হাসির মর্যাদা

পৃথিবীতে মানুষই সম্ভবত একমাত্র প্রাণী যে হাসতে পারে । বিজ্ঞানীরা মনে করেন , কথা বলতে শেখার লক্ষ লক্ষ বছর আগে মানুষ হাসতে শিখেছে । আমাদের আদিম পূর্বপুরুষরা সম্ভবত হাসির মাধ্যমেই মনের অনেক ভাব আদানপ্রদান করত । হাসি মানুষের ইনস্টিংক্ট বা সহজাত প্রবৃত্তি , মানবশিশু জন্মের প্রায় পর - পরই হাসতে পারে । এমনকি যেসব শিশু জন্ম থেকেই অন্ধ ও বধির যারা কোনও দিন কাউকে হাসতে দেখেনি বা শুনেনি তারাও হাসতে পারে । মানুষ সাধারণত মনের ভাল লাগার অনুভূতি প্রকাশ করে হাসির মাধ্যমে । এই হাসি স্বত : স্ফূর্ত — অনায়াস ; সচেতন মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় । মানুষ অবশ্য স্বেচ্ছায় , স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও হাসতে পারে ; যেমন কপট হাসি । উভয় ক্ষেত্রেই মনে ভাল লাগার অনুভূতি সৃষ্টি হয় । কারণ উভয় ক্ষেত্রেই দেহে এন্ডরফিন নামের এক ধরণের হরমোন নিঃসৃত হয় যার প্রভাবে দেহ-মনে ভাল লাগার অনুভূতি সঞ্চারিত হয় । অনেকে মনে করেন হাসি স্বাস্থ্যপ্রদ । বলা হয়ে থাকে , ‘প্রতিদিন হাসলে ডাক্তার দূরে থাকে’ , ‘হাসি শ্রেষ্ঠ ওষুধ’ , ইত্যাদি । মানুষের মন প্রফুল্ল থাকলে তার শারীরিক স্বাস্থ্যও ভাল থাকবে সেটাই স্বাভাবিক । কিন্তু আমেরিকার মে...

ভালবাসা কারে কয়

‘ ভালবাসা ’ — শব্দটি উচ্চারিত হতেই মনে হয় যেন নিজেরই হৃদস্পন্দন একবার নিঃশব্দে দোলা দিয়ে উঠল । ‘ ভাল ’ এবং ‘ বাসা ’ — এই দুই উপাদানের মিলনে শব্দটির জন্ম ; যেন কোন সুগভীর অনুভূতি ও সুগন্ধি ধাতুর মেশালেই তৈরি হয় এমন এক মিশ্রণ , যার স্বাদ ভাষা ছাড়িয়ে প্রাণে গিয়ে ঠেকে । ‘ বাস্ ’ ধাতুর অর্থ ‘ সুগন্ধ ’ — এই তথ্যটি কেবল অভিধানের জ্ঞান নয় ; এটি যেন ইঙ্গিত করে যে , ভালবাসা আসলে এমন কিছু , যা মানুষের বুকে নীরবে সুবাস ছড়ায় । যে হৃদয়ে কেউ সত্যিই আপন হয়ে ওঠে , তার ভেতর দিয়ে যেন এক অভিনব আতর নিঃশব্দে প্রবাহিত হয় — এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ যে বাইরে থেকে কোনও সুগন্ধির প্রয়োজনই থাকে না । আজ আমরা ‘ ভালবাসা ’ কে ইংরেজি love- এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করি । কিন্তু ভাষার ইতিহাস বলে , সময় এমন ছিল যখন ‘ ভালবাসা ’ মানে ছিল কেবল ‘ ভাল বলে অনুভব করা ’ । বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন , দুইশো বছর আগের বাংলা ভাষায় ‘ ভালবাসা ’ মানে ছিল ‘ অনুভব করা ’, ‘ মনে হওয়া ’ । তাই তখন ‘ ভালবাসা ’ যেমন ছিল , তেমনই ছিল ‘ মন্দবাসা ’, ‘ ভয়বাসা ’, ‘ ঘৃণাবাসা ’, ‘ লজ্জাবাসা ’ — কী অনুভব ক...

জীবনের প্রকৃত শান্তি: আলেকজান্ডার ও দিওগেনেসের গল্প

Image
প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিসে বাস করতেন দিওগেনেস — অদ্ভুত আচরণ আর তীক্ষ্ণ বোধের এক দার্শনিক। তিনি দিনের আলোয় প্রদীপ হাতে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন , বলতেন — “আমি একজন সৎ মানুষ খুঁজছি।” তাঁর এই অদ্ভুত অনুসন্ধান অনেককে হাসিয়েও তুলত , কিন্তু সেই কৌতুকের আড়ালে ছিল মানুষের ভেতরের সত্যকে আবিষ্কারের নিরন্তর সাধনা । এই একই সময়ে আরেকজন গ্রিক ছিলেন যাঁর নাম ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে — আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল বলকান থেকে হিমালয় , মিশর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত। ক্ষমতা , যুদ্ধকৌশল ও সাফল্যের বিপুল চূড়ায় দাঁড়িয়েও আলেকজান্ডার গভীর শ্রদ্ধা করতেন দিওগেনেসের প্রতি ; এমনকি বলতেন , “ পরজন্মে সুযোগ পেলে আলেকজান্ডার নয় — দিওগেনেস হয়ে জন্মাতে চাই।” গ্রীষ্মের এক দুপুরে নদীর তীরে গাছের নীচে নিরাবরণ আরামে শুয়ে ছিলেন দিওগেনেস। হঠাৎ ছায়া পড়ে তাঁর শরীরে। চোখ খুলে দেখলেন — অশ্বারোহণ করে দ্রুত এগিয়ে আসছেন আলেকজান্ডার। নতুন দেশ অভিযানের আগে সম্রাটের দিওগেনেসের কাছে আশীর্বাদ নিতে আসা ছিল নিয়মের মতোই । কাছে এসে আলেকজান্ডার মাথা নত করে প্রণাম করলেন । দিওগেনেস অর্ধহাস্যে জিজ্ঞেস করলেন — “...

সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ — সৃষ্টিতত্ত্বের মূলভাব

Image
এই বিশ্ব ঈশ্বরের প্রকাশিত রূপ , আর ঈশ্বর — এই বিশ্বের অপ্রকাশিত রূপ। প্রত্যেক বস্তুর রয়েছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য রূপ। যা প্রকাশ্য তা সীমা দ্বারা বেষ্টিত , অর্থাৎ সসীম। আর যা অপ্রকাশ্য তা সীমার অতীত , অর্থাৎ অসীম। ঈশ্বর নিরাকার , কিন্তু সৃষ্টির লীলা চরিতার্থ করার জন্য তিনি যে-কোনও আকার ধারণ করতে পারেন। যখন তিনি কোনও আকার ধারণ করেন , অর্থাৎ সীমা গ্রহণ করেন , তখন কোনও কিছুর সৃষ্টি হয়। সীমাই সৃষ্টি , আর ' অসীম ' — সকল সৃষ্টির উৎস। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন , ‘The revelation of the infinite in the finite is the motive of all creation.’ সীমার মধ্যে ‘অসীম’ নিজেকে প্রকাশ করবে সেটাই সমস্ত সৃষ্টির মূলভাব। সমস্ত সৃষ্টি তাঁরই অভিব্যক্ত রূপ। সীমা ও অসীম পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও বিরুদ্ধ নয় ; একটি থাকলে আরেকটি থাকবেই। সীমা ও অসীমের সম্পর্কটি পারস্পরিক—প্রেমের ও আনন্দের। অর্থাৎ , ' সীমা অসীমের পক্ষে যতখানি , অসীমও সীমার পক্ষে ততখানি ; উভয়ের উভয়কে নহিলে নয় ' । তাই , অসীমের আনন্দ সীমার উপর নির্ভরশীল , সীমা না থাকলে অসীমের প্রেম মিথ্যে হয়ে যেত। যিনি অসীম , তিনি সীমার দ্বারাই নিজেকে প্রকাশ কর...