অন্তর শব্দের দুটি অর্থ: দূরত্ব ও হৃদয়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে আছে — ‘তব মুখ সদা মনে জাগিতেছে সংগোপনে, তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল-কিনারা’। এখানে ‘অন্তর’ মানে ব্যবধান, দূরত্ব। কিন্তু এই দূরত্ব পরিমাপের উপায় আছে কী?
মহাভারতে শ্রী কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে বলেছেন, ‘অন্তর শব্দের দুটি অর্থ — দূরত্ব ও হৃদয়। দুটি মানুষের মধ্যেকার দূরত্ব ক্রোশের হিসাবে মাপা যায় না। মনের ভাবনা দিয়ে মাপতে হয়।’
দূরত্ব বা ব্যবধান (তিন দিন অন্তর) এবং হৃদয় (অন্তর মম বিকশিত করো) — অন্তর শব্দের এই দ্বৈত অর্থের গভীর তাৎপর্য রয়েছে ভাষা, দর্শন ও মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
সংস্কৃত ধাতু থেকে আসা ‘অন্তর’ শব্দটি মূলত ‘ভিতরে’ বা ‘মাঝখানে’ বোঝায়। এর দুই অর্থ (হৃদয় এবং ব্যবধান) আসলে এই মূল ধারণা থেকে উদ্ভূত।
হৃদয় (অন্তর) মানে যা সত্যিকারের ভিতরে, আত্মার কেন্দ্রস্থলে থাকে। এটি বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ।
ব্যবধান (অন্তর) মানে যা দুটি বস্তু বা ব্যক্তির মাঝখানে আছে।
এর অর্থ: যা আমাদের সবচেয়ে ভিতরে (হৃদয়), সেটিই আসলে দুইয়ের মাঝখানে ব্যবধান তৈরি করে। অর্থাত্, আমাদের হৃদয়ের অবস্থাই নির্ধারণ করে আমরা কতটা কাছাকাছি বা দূরে অছি।
যদি হৃদয়ে ঐক্য, প্রেম, সহানুভূতি থাকে — ব্যবধান কমে যায়। আর যদি হৃদয়ে অহংকার, ঘৃণা, অবিশ্বাস থাকে — তাহলে শারীরিকভাবে কাছে থাকলেও অন্তর (ব্যবধান) তৈরি হয়।
অন্তর (হৃদয়) যদি শুদ্ধ হয়, তাহলে সব ব্যবধান মিথ্যা হয়ে যায়। অর্থাত্, অন্তরের (হৃদয়ের) পরিবর্তনের মাধ্যমেই অন্তর (ব্যবধান) দূর হয়। যখন দুটি হৃদয় কাছে আসে, তখন ‘অন্তর’ শব্দের দুটি অর্থই এক হয়ে যায় — হৃদয়ও মিলে যায়, ব্যবধানও মুছে যায়। আর কেবল তখনই ‘অদ্বৈত’ অবস্থায় পৌঁছানো যায়।