Posts

অন্তর শব্দের দুটি অর্থ: দূরত্ব ও হৃদয়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে আছে — ‘ তব মুখ সদা মনে জাগিতেছে সংগোপনে , তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল-কিনারা ’ । এখানে ‘ অন্তর ’ মানে ব্যবধান , দূরত্ব। কিন্তু এই দূরত্ব পরিমাপের উপায় আছে কী ? মহাভারতে শ্রী কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে বলেছেন , ‘ অন্তর শব্দের দুটি অর্থ — দূরত্ব ও হৃদয়। দুটি মানুষের মধ্যেকার দূরত্ব ক্রোশের হিসাবে মাপা যায় না। মনের ভাবনা দিয়ে মাপতে হয়। ’ দূরত্ব বা ব্যবধান (তিন দিন অন্তর) এবং হৃদয় (অন্তর মম বিকশিত করো) — অন্তর শব্দের এই দ্বৈত অর্থের গভীর তাৎপর্য রয়েছে ভাষা , দর্শন ও মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে । সংস্কৃত ধাতু থেকে আসা ‘ অন্তর ’ শব্দটি মূলত ‘ ভিতরে ’ বা ‘ মাঝখানে ’ বোঝায়। এর দুই অর্থ (হৃদয় এবং ব্যবধান) আসলে এই মূল ধারণা থেকে উদ্ভূত। হৃদয় (অন্তর) মানে যা সত্যিকারের ভিতরে , আত্মার কেন্দ্রস্থলে থাকে । এটি বাহ্যিক নয় , অভ্যন্তরীণ । ব্যবধান (অন্তর) মানে যা দুটি বস্তু বা ব্যক্তির মাঝখানে আছে । এর অর্থ: যা আমাদের সবচেয়ে ভিতরে (হৃদয়) , সেটিই আসলে দুইয়ের মাঝখানে ব্যবধান তৈরি করে। অর্থাত্‍ , আমাদের হৃদয়ের অবস্থাই নির্ধারণ করে আমরা কতটা কাছাকাছি বা দূরে অছি । যদি ...

মহাবিশ্বে মহাকাব্যে

মহাবিশ্বের ইংরেজি শব্দ Universe অত্যন্ত সুন্দর এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। শব্দটি তৈরি হয়েছে Uni ( এক) এবং Verse ( ছন্দোবদ্ধ রচনা) এই দুটি শব্দের মিলনের ফলে । সুতরাং , Universe- এর প্রকৃত অর্থ এক অনন্ত কবিতা — এক মহাকাব্য , এক মহাসংগীত , যার প্রতিটি নক্ষত্র , গ্রহ , নদী , বৃক্ষ , প্রাণ এবং মানুষ সেই সৃষ্টির অমর পঙ্‌ক্তিমালার অংশ । এই দৃষ্টিতে মহাবিশ্ব কেবল জড় পদার্থের সমষ্টি নয় ; এটি এক সৃজনশীল প্রকাশ। আকাশগঙ্গার ঘূর্ণন , নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু , ঋতুর আবর্তন , ফুলের প্রস্ফুটন , পাখির গান , মানুষের হাসি-কান্না — সবকিছু মিলিয়ে যেন এক বিশাল সিম্ফনি , এক অনন্ত কাব্যধারা। আর যিনি এই মহাকাব্যের স্রষ্টা তিনি মহাকবি — যাঁর কল্পনা ও সৃজনশক্তির বিস্তার অসীম । এই অনুভব থেকে সেই মহাকবির উদ্দেশে বলা যায় — ‘ মহাবিশ্বে মহাকাব্যে তুমি আছ অসীম রহস্যে । ’ মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা , প্রতিটি ঘটনা , প্রতিটি প্রাণের অন্তরালে যেন লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় উপস্থিতি। বিজ্ঞান সেই রহস্যের সূত্র খোঁজে , দর্শন তার অর্থ অনুসন্ধান করে , আর কবিতা তার সৌন্দর্য অনুভব করে । আমরা প্রত্যেকেই এই মহাকাব্যের একটি পঙ্‌ক্...

সনাতন ধর্ম: চিরন্তন সত্য ও হিন্দুর জীবনদর্শন

‘ সনাতন ধর্ম’ — এক গভীরতর ভাবধারার নাম , যা হিন্দুধর্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হলেও তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত , অনেক ব্যাপক। হিন্দুরা তাঁদের ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যকে ‘সনাতন ধর্ম’ বলেই চিহ্নিত করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল , ‘ সনাতন’ শব্দটির তাৎপর্য কী ? কেনই বা এই ধর্মকে ‘সনাতন’ বলা হয় ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন । শব্দতত্ত্ব: ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’ শব্দের অন্তর্নিহিত ব্যাকরণ ‘ সনাতন ’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘সন’ ধাতু থেকে , যার অর্থ — চিরন্তন , অনাদি , অবিনাশী। অর্থাৎ , যা কালের সীমায় আবদ্ধ নয় , যা সর্বকালেই সত্য , তা-ই সনাতন । ‘ ধর্ম ’ শব্দের উৎস ‘ধৃ’ ধাতু — যার অর্থ ধারণ করা। যে তত্ত্ব ব্যক্তি , সমাজ ও বিশ্বকে ধরে রাখে , সংহত রাখে , শৃঙ্খলাবদ্ধ করে — তা-ই ধর্ম । এই অর্থে , ‘ সনাতন ধর্ম’ হল সেই অনাদি নৈতিক শক্তি , যা ব্যক্তি ও সমাজকে চিরকাল ধরে ধারণ করে চলেছে । সনাতন ধর্মের দুই প্রাসঙ্গিক অর্থ সনাতন ধর্ম মূলত দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়: ১) প্রচলিত ও প্রাচীন ধর্ম অর্থে: যদিও সনাতন ধর্মের উৎপত্তি অতি প্রাচীন , ‘ সনাতন ধর্ম’ শব্দটি ব্যবহারিক গুরুত্ব পায় ইসলামি যুগের পর। ১২০৬ খ্রি...

হিন্দুত্ব বনাম হিন্দুইজম: ধর্ম নাকি জীবনদর্শন?

হিন্দু কি একটি মতবাদ ? হিন্দু শব্দের প্রকৃত ব্যাখ্যা কী ? হিন্দু ও হিন্দুইজম কি সমার্থক ? সম্প্রতি , এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করা হয়েছে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড হিন্দু কংগ্রেস’-এর বার্ষিক সম্মেলনে। ২৪-২৬ নভেম্বর , ২০২৩-এ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত সেই সম্মেলনে ৬১টি দেশ থেকে ২ , ০০০-এরও বেশি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব , সংগঠন ও প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন । এই বিশ্ব হিন্দু সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা গৃহীত হয় , যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘হিন্দুইজম’ ( Hinduism) শব্দকে বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং এর পরিবর্তে ‘হিন্দুত্ব’ ( Hindutva) ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়। এখন থেকে , ‘ হিন্দুত্ব’ হবে বিশ্বের ১০০টি দেশে বসবাসরত ১২০ কোটির বেশি মানুষের জীবনদর্শনের প্রতীক , যা সকলের সংস্থান ও সহাবস্থানকে সুনিশ্চিত করে । হিন্দুত্ব: জীবনদর্শন নাকি মতবাদ ? ‘ হিন্দুত্ব’ নতুন কোনও ধারণা নয়। যখন থেকে হিন্দু জাতির উৎপত্তি , তখন থেকেই ‘হিন্দুত্ব’ বিদ্যমান। এটি হিন্দুদের বৈশিষ্ট্যগত ভাব , যেমন মানুষের মনুষ্যত্ব , দেবতার দেবত্ব। এটি ‘হিন্দুনেস’ ( Hinduness) নামে পরিচিত হতে পারে , তবে ‘হিন্দুইজম’ কখনওই নয় । ‘ হিন...

বাটারফ্লাই ইফেক্ট: সামান্য পরিবর্তনের বিশাল প্রভাব

Image
দিল্লিতে যদি একটি প্রজাপতি ডানা ঝাপটায় , তবে সেই ডানা ঝাপটানোর কারণে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হতে পারে কি ? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা যা জানি , তা ঠিক না-ও হতে পারে । বিশিষ্ট মার্কিন গণিতবিদ এবং আবহাওয়াবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ মনে করেন , প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর কারণে ঘূর্ণিঝড় হতেও পারে । লরেঞ্জের উক্তি — ‘When a butterfly flutters its wings in one part of the world, it can eventually cause a hurricane in another’ । এই অদ্ভুত বক্তব্যের সমর্থনে তিনি যে তত্ত্ব দাঁড় করেছেন তার নাম দিয়েছেন ‘ বাটারফ্লাই ইফেক্ট ’ । এই তত্ত্ব অনুসারে একটি বিশৃঙ্খল এবং জটিল সিস্টেমের একপ্রান্তে ঘটিত অতি ক্ষুদ্র কোনও পরিবর্তন বা ঘটনা  (যেমন , প্রজাপতির পাখা ঝাপটানো) অন্যপ্রান্তে বৃহত্তর এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফল তৈরি করতে পারে , যেমন একটি ঘূর্ণিঝড় । বাটারফ্লাই ইফেক্ট এডওয়ার্ড লরেঞ্জ গবেষণা করেছেন আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে । তিনি দেখিয়েছেন যে , একটি প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর মতো ক্ষুদ্র ঘটনা অন্যত্র আবহাওয়ার বিরাট পরিবর্তনের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে । তাছাড়া , গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে লরেঞ্জ যে গ্রাফ পেয়েছেন তা দে...