ভালবাসা কারে কয়

ভালবাসা’ — শব্দটি উচ্চারিত হতেই মনে হয় যেন নিজেরই হৃদস্পন্দন একবার নিঃশব্দে দোলা দিয়ে উঠলভালএবংবাসা’ — এই দুই উপাদানের মিলনে শব্দটির জন্ম; যেন কোন সুগভীর অনুভূতি ও সুগন্ধি ধাতুর মেশালেই তৈরি হয় এমন এক মিশ্রণ, যার স্বাদ ভাষা ছাড়িয়ে প্রাণে গিয়ে ঠেকেবাস্ধাতুর অর্থসুগন্ধ’ — এই তথ্যটি কেবল অভিধানের জ্ঞান নয়; এটি যেন ইঙ্গিত করে যে, ভালবাসা আসলে এমন কিছু, যা মানুষের বুকে নীরবে সুবাস ছড়ায় যে হৃদয়ে কেউ সত্যিই আপন হয়ে ওঠে, তার ভেতর দিয়ে যেন এক অভিনব আতর নিঃশব্দে প্রবাহিত হয়এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ যে বাইরে থেকে কোনও সুগন্ধির প্রয়োজনই থাকে না

আজ আমরাভালবাসাকে ইংরেজি love-এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করি কিন্তু ভাষার ইতিহাস বলে, সময় এমন ছিল যখনভালবাসামানে ছিল কেবলভাল বলে অনুভব করা বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, দুইশো বছর আগের বাংলা ভাষায়ভালবাসামানে ছিলঅনুভব করা’, ‘মনে হওয়া তাই তখনভালবাসাযেমন ছিল, তেমনই ছিলমন্দবাসা’, ‘ভয়বাসা’, ‘ঘৃণাবাসা’, ‘লজ্জাবাসা’ — কী অনুভব করছি তা-ই ছিল শব্দের কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ অনুভূতির রসায়নই শব্দকে অর্থ দিত; অনুভবকে ভাষা ধারণ করত সরলতায়

সে সময় প্রেম-প্রণয়ের জন্য জনপ্রিয় ছিলপিরীতি’ — সংস্কৃতপ্রীতির স্বাভাবিক বাংলা রূপ আজ সেই শব্দটিকে ভদ্র-সমাজে অশিষ্ট মনে করা হয়; যেন শব্দটির সামাজিক মর্যাদা মাটির নিচে ডুবে গেছে ভাষা যে বেঁচে থাকে, পরিবর্তিত হয়, ক্ষয়প্রাপ্ত হয় — ‘পিরীত’-এর অবনমন তা-ই বলে দেয় ভবিষ্যতে হয়তোভালবাসাও আজকের উচ্চ আসন ধরে রাখতে পারবে না; হয়তো কখনও ইংরেজি love তার জায়গা দখল করবে আর love শব্দের উৎস সংস্কৃতলোভাবালোভ’, অর্থাৎ লালসা ও আকাঙ্ক্ষাআজ তার অর্থও বদলে গেছে একসময় I love you কথাটার মানে হতোআমি তোমাকে লোভ করি’, এই তথ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়: শব্দচেতনার ইতিহাসও আসলে এক ধরনের প্রেমকাহিনি, যেখানে অর্থ বদলায়, অনুভূতির পরিসর বড় হয়, কখনও বা ছোট হয়ে আসে

কিন্তু শব্দের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ শেষে থেকেই যায় একটি প্রাচীন প্রশ্নভালবাসা কারে কয়?

রবীন্দ্রনাথ এ প্রশ্ন করেছেন, আবার নিজেই উত্তরও দিয়েছেন প্রশ্ন ছুঁড়ে — ‘সে কি কেবলই যাতনা?’, ‘সে কি কেবলই দুখের শ্বাস?’

এই প্রশ্নের আড়ালেই লুকিয়ে আছে তাঁর অস্পষ্ট উত্তর: ভালবাসা এমন এক জিনিস যার কোনও একক সংজ্ঞা নেই

কারণ ভালবাসা মূলত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয়, এবং অভিজ্ঞতা যেমন মানুষে মানুষে বদলায়, তেমনি বদলায় ভালবাসার অর্থ ও রূপ যখন কেউ অন্য একজন স্নেহশীল মানুষের মনের আয়নায় নিজের সৌন্দর্য, নিজের উত্‍কর্ষ, নিজের সম্ভাবনা প্রতিফলিত হতে দেখে, তখনই জন্ম নেয় ভালবাসা ভালবাসা যেন সেই আয়না, যেখানে প্রত্যেকে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে তাই একজনের ভালবাসা আরেকজনের ভালবাসার সঙ্গে হুবহু মেলে নামেলাও উচিত নয় কারণ প্রতিটি হৃদয়ের পথ আলাদা; প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা, প্রতিটি ক্ষত, প্রতিটি স্বপ্ননিজস্ব

ভালবাসা নিয়ে মানুষ যত বইই রচুক, যত মনস্তত্ত্ব-শারীরতত্ত্বের সূত্রই আবিষ্কার করুকসে সব জ্ঞান কেবলভালবাসা সম্পর্কেজানা; দূর থেকে, তটরেখা থেকে দেখা কিন্তু ভালবাসা কীএই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর বই থেকে পাওয়া যায় না; এটি পেতে হলে জলে নেমে স্নান করতে হয় সরাসরি অনুভব করতে হয়

কারও সম্পর্কে জানা আর কাউকে নিজে জানাএই পার্থক্য যেমন গভীর, তেমনি গভীর ভালবাসাকে জানা ও ভালবাসা সম্পর্কে জানাএই দুইয়ের ব্যবধান

তাই শেষ পর্যন্ত সত্যটি খুব সোজা

ভালবাসা কারে কয়জানা যাবে তখনই, যখন একদিন তুমি নিজেই প্রেমে পড়বে

প্রেমের জলে ডুব দিয়ে তবেই বোঝা যায় নদীর স্রোত কেমন, তার শীতলতা কেমন, তার ডাকে কী রহস্য লুকানো

ভালবাসা তাই কোনও সংজ্ঞা নয়, কোনও তত্ত্ব নয়এ এক যাত্রা

যার পথ আপনি নিজেই তৈরি করেন, নিজের হৃদয়ের ভেতর দিয়ে 


অসীম দে
গুয়েল্ফ, অন্টারিও, কানাডা 

Popular posts from this blog

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ চেনার উপায়

সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ — সৃষ্টিতত্ত্বের মূলভাব

অমাবস্যা ও পূর্ণিমা — চন্দ্রসূর্যের মিলন ও বিরহ তিথি

তেলের সামাজিক মাহাত্ম্য

ঈশ্বর, প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

রাসলীলা মাহাত্ম্য

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

সূর্য উপাসনা

হৃদয়-দর্পনে দেখা