Posts

ভালবাসা কারে কয়

‘ ভালবাসা ’ — শব্দটি উচ্চারিত হতেই মনে হয় যেন নিজেরই হৃদস্পন্দন একবার নিঃশব্দে দোলা দিয়ে উঠল । ‘ ভাল ’ এবং ‘ বাসা ’ — এই দুই উপাদানের মিলনে শব্দটির জন্ম ; যেন কোন সুগভীর অনুভূতি ও সুগন্ধি ধাতুর মেশালেই তৈরি হয় এমন এক মিশ্রণ , যার স্বাদ ভাষা ছাড়িয়ে প্রাণে গিয়ে ঠেকে । ‘ বাস্ ’ ধাতুর অর্থ ‘ সুগন্ধ ’ — এই তথ্যটি কেবল অভিধানের জ্ঞান নয় ; এটি যেন ইঙ্গিত করে যে , ভালবাসা আসলে এমন কিছু , যা মানুষের বুকে নীরবে সুবাস ছড়ায় । যে হৃদয়ে কেউ সত্যিই আপন হয়ে ওঠে , তার ভেতর দিয়ে যেন এক অভিনব আতর নিঃশব্দে প্রবাহিত হয় — এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ যে বাইরে থেকে কোনও সুগন্ধির প্রয়োজনই থাকে না । আজ আমরা ‘ ভালবাসা ’ কে ইংরেজি love- এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করি । কিন্তু ভাষার ইতিহাস বলে , সময় এমন ছিল যখন ‘ ভালবাসা ’ মানে ছিল কেবল ‘ ভাল বলে অনুভব করা ’ । বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন , দুইশো বছর আগের বাংলা ভাষায় ‘ ভালবাসা ’ মানে ছিল ‘ অনুভব করা ’, ‘ মনে হওয়া ’ । তাই তখন ‘ ভালবাসা ’ যেমন ছিল , তেমনই ছিল ‘ মন্দবাসা ’, ‘ ভয়বাসা ’, ‘ ঘৃণাবাসা ’, ‘ লজ্জাবাসা ’ — কী অনুভব ক...

জীবনের প্রকৃত শান্তি: আলেকজান্ডার ও দিওগেনেসের গল্প

Image
প্রায় দুই হাজার বছর আগে গ্রিসে বাস করতেন দিওগেনেস — অদ্ভুত আচরণ আর তীক্ষ্ণ বোধের এক দার্শনিক। তিনি দিনের আলোয় প্রদীপ হাতে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন , বলতেন — “আমি একজন সৎ মানুষ খুঁজছি।” তাঁর এই অদ্ভুত অনুসন্ধান অনেককে হাসিয়েও তুলত , কিন্তু সেই কৌতুকের আড়ালে ছিল মানুষের ভেতরের সত্যকে আবিষ্কারের নিরন্তর সাধনা । এই একই সময়ে আরেকজন গ্রিক ছিলেন যাঁর নাম ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে — আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল বলকান থেকে হিমালয় , মিশর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত। ক্ষমতা , যুদ্ধকৌশল ও সাফল্যের বিপুল চূড়ায় দাঁড়িয়েও আলেকজান্ডার গভীর শ্রদ্ধা করতেন দিওগেনেসের প্রতি ; এমনকি বলতেন , “ পরজন্মে সুযোগ পেলে আলেকজান্ডার নয় — দিওগেনেস হয়ে জন্মাতে চাই।” গ্রীষ্মের এক দুপুরে নদীর তীরে গাছের নীচে নিরাবরণ আরামে শুয়ে ছিলেন দিওগেনেস। হঠাৎ ছায়া পড়ে তাঁর শরীরে। চোখ খুলে দেখলেন — অশ্বারোহণ করে দ্রুত এগিয়ে আসছেন আলেকজান্ডার। নতুন দেশ অভিযানের আগে সম্রাটের দিওগেনেসের কাছে আশীর্বাদ নিতে আসা ছিল নিয়মের মতোই । কাছে এসে আলেকজান্ডার মাথা নত করে প্রণাম করলেন । দিওগেনেস অর্ধহাস্যে জিজ্ঞেস করলেন — “...

সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ — সৃষ্টিতত্ত্বের মূলভাব

Image
এই বিশ্ব ঈশ্বরের প্রকাশিত রূপ , আর ঈশ্বর — এই বিশ্বের অপ্রকাশিত রূপ। প্রত্যেক বস্তুর রয়েছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য রূপ। যা প্রকাশ্য তা সীমা দ্বারা বেষ্টিত , অর্থাৎ সসীম। আর যা অপ্রকাশ্য তা সীমার অতীত , অর্থাৎ অসীম। ঈশ্বর নিরাকার , কিন্তু সৃষ্টির লীলা চরিতার্থ করার জন্য তিনি যে-কোনও আকার ধারণ করতে পারেন। যখন তিনি কোনও আকার ধারণ করেন , অর্থাৎ সীমা গ্রহণ করেন , তখন কোনও কিছুর সৃষ্টি হয়। সীমাই সৃষ্টি , আর ' অসীম ' — সকল সৃষ্টির উৎস। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন , ‘The revelation of the infinite in the finite is the motive of all creation.’ সীমার মধ্যে ‘অসীম’ নিজেকে প্রকাশ করবে সেটাই সমস্ত সৃষ্টির মূলভাব। সমস্ত সৃষ্টি তাঁরই অভিব্যক্ত রূপ। সীমা ও অসীম পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও বিরুদ্ধ নয় ; একটি থাকলে আরেকটি থাকবেই। সীমা ও অসীমের সম্পর্কটি পারস্পরিক—প্রেমের ও আনন্দের। অর্থাৎ , ' সীমা অসীমের পক্ষে যতখানি , অসীমও সীমার পক্ষে ততখানি ; উভয়ের উভয়কে নহিলে নয় ' । তাই , অসীমের আনন্দ সীমার উপর নির্ভরশীল , সীমা না থাকলে অসীমের প্রেম মিথ্যে হয়ে যেত। যিনি অসীম , তিনি সীমার দ্বারাই নিজেকে প্রকাশ কর...

প্রশ্ন–উত্তর–প্রশ্ন

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ত্রুটি হল, এখানে যে বেশি জানে সে প্রশ্ন করে, আর যে কম জানে সে উত্তর দেয়। শিক্ষক প্রশ্ন করে আর ছাত্র উত্তর দেয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদের প্রশ্ন করতে শেখানো হয় না; শেখানো হয়, কি করে প্রশ্নের উত্তর লিখতে হয়। একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে প্রশ্ন করার সহজাত ক্ষমতা নিয়ে, প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই সে পৃথিবীকে জানতে চায়। অজস্র প্রশ্ন দিয়ে পিতামাতাকে অতিষ্ঠ করে তুলে। পরবর্তীতে, ধীরে ধীরে যতই সে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে, ততই প্রশ্ন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে থাকে। অবশেষে, যখন সে সাফল্যের সহিত পাঠ্যক্রম সমাপ্ত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তার আর কোনও প্রশ্ন থাকে না, যেন সব প্রশ্নের উত্তর সে ইতিমধ্যে জেনে গেছে। একটি প্রশ্নের উত্তর যে আরেকটি প্রশ্ন দিয়ে করা যায়, এবং প্রশ্নের উত্তরের উপরও যে প্রশ্ন করা যায়, সে কথাটা একদম শেখানো হয় না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কারণ, রাষ্ট্র ধর্ম সমাজ সর্বত্র মানুষ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। প্রকৃতি মানুষকে দিয়েছে প্রশ্ন করার ক্ষমতা সত্যকে জানার জন্য, আর সমাজ তা কেড়ে নিয়েছে কায়েমি বন্দোবস্ত নিরাপদ রাখা...

দক্ষিণ দুয়ারী ঘর

প্রাচীন কাল থেকেই দক্ষিণ-দুয়ারী ঘর সমাদৃত হয়ে আসছে। প্রাচীন স্থাপত্যবিদ্যা ভারতীয় 'বাস্তুশাস্ত্র' এবং চীন দেশীয় ‘ফেং-শুই’-তে দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলার খনার বচনে বলা হয়েছে: ‘দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজা, পূব দুয়ারী তাহার প্রজা পশ্চিম দুয়ারীর মুখে ছাই, উত্তর দুয়ারীর খাজনা নাই।’ দক্ষিণ দুয়ারী ঘর সমাদৃত হওয়ার অন্যতম কারণ বোধ হয় দখিন-হাওয়া। দক্ষিণ সমুদ্রের সজল বাতাস অনায়াসে গৃহে প্রবেশ করে দেহমন সতেজ করবে সেটাই হয়ত সবার আকাংখা। কিন্তু জনাকীর্ণ ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে সবসময় দক্ষিণ দিকে দরজা রেখে গৃহ নির্মাণ করা নিশ্চয়ই দুরূহ ব্যাপার। তবে কেউ যদি ঘর বাঁধতে চায় ঠিক উত্তর মেরুতে তা হলে আর ভাবনার কিছু নেই। কারণ সেখানে ঘরের দরজা যে দিকেই হোক না কেন তা হবে দক্ষিণমুখী। উত্তর মেরুতে নির্মিত ঘর যদি হয় চার দেয়ালের, আর প্রত্যেক দেয়ালে থাকে একটি করে দরজা তা হলে চারটি দরজাই হবে দক্ষিণমুখী, এবং সবকটি দরজা দিয়েই বইবে দখিন হাওয়া — প্রাণসঞ্জীবনী দখিন হাওয়া।  ▣ ✍ অসীম দে গুয়েল্ফ, অন্টারিও, কানাডা  

মাটির প্রদীপ

Image
মাটির প্রদীপ আমাদের সংস্কৃতিতে সুপ্রাচীন কাল থেকেই পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পূজার্চনা , মঙ্গলকামনা , কিংবা শ্রদ্ধা জানাতে মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। প্রদীপের মাটির অংশটি পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করে , আর শিখাটি দেবলোকের। গ্রীক পুরাণের প্রমিথিউস দেবলোক থেকে আগুন চুরি করে মর্তের মানুষকে উপহার দিয়েছিলেন , এই আগুন দেবলোকের ধন। আগুনের শিখা সবসময় ঊর্ধ্বাভিমুখী , এক দিব্যসত্তার প্রতীক। মাটির প্রদীপ রবীন্দ্রনাথের গানে আছে — ‘আমার এই দেহখানি তুলে ধরো , তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো’। মাটির প্রদীপ মানবদেহের প্রতীক ; বৃষ্টির জল আর মাটি দিয়ে তৈরি হয় মানুষের দেহ , আর দেবলোকের আগুনে প্রাণের প্রদীপ জ্বেলে মানুষ পৃথিবীতে আসে। মানুষের দেহ এই পৃথিবীর , কিন্তু প্রাণের শিখাটি দেবলোকের। এই পার্থিব দেহ ও ঐশী শিখার সম্মিলনে মানুষ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি মানুষ যেন এক-একটি মাটির প্রদীপ — নশ্বর কাদামাটির আধারে অবিনশ্বর আগুনের চৈতন্যশিখা। এই চৈতন্যশিখাকে কেউ বলেন চৈতন্য , কেউ বলেন আত্মা , বাউল সাধকরা বলেন ‘অধর মানুষ’। জাতি , ধর্ম , বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের দেহে প্রদীপ্ত প্রাণের একই চৈতন্যশিখা...

গানের ভিতর দিয়ে : অস্তিত্বের দার্শনিক অন্বেষণ

Image
মানুষ চিরকালই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে — এই বিশ্বজগৎ আসলে কী ? একটি যান্ত্রিক কাঠামো , না কি কোনও গভীরতর অর্থবাহী সত্তা ? এই প্রশ্নের উত্তরে বিভিন্ন সভ্যতা , বিভিন্ন সময় , বিভিন্ন ভাষায় প্রায় একই ইঙ্গিত রেখে গেছে — জগৎ মূলত সুরময়। সে কঠিন বস্তু নয় , বরং প্রবহমান কম্পন ; সে নীরব নয় , বরং নৈঃশব্দ্যের অন্তর্লীন সংগীত । খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রিক দার্শনিক ও গণিতবিদ পিথাগোরাস প্রথম এই সুরময় বিশ্বভাবনাকে সুসংহত রূপ দেন। তাঁর কাছে মহাবিশ্ব ছিল এক বিশাল বাদ্যযন্ত্র , যেখানে গ্রহ-নক্ষত্রদের গতি এক ধরনের সংগীত সৃষ্টি করে — যাকে তিনি নাম দেন Music of the Spheres । এই সংগীত কানে শোনা যায় না , কিন্তু তা অস্তিত্বের গভীরে নিরন্তর বাজতে থাকে। পিথাগোরাসের দর্শনে সংখ্যা , অনুপাত ও সুর একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয় ; বরং সংখ্যা থেকেই সুর , আর সুর থেকেই গঠন পায় বিশ্বরূপ । আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্রিং-তত্ত্ব যেন অজান্তেই এই প্রাচীন অন্তর্দৃষ্টিকে নতুন ভাষায় ফিরিয়ে এনেছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী , জগতের মৌলিক একক কোনও কঠিন কণা নয় , বরং অতি সূক্ষ্ম কম্পমান ‘স্ট্রিং’। তাদের কম্পনের ভিন্নতায় সৃষ্টি হয় ভিন...