গানের ভিতর দিয়ে : অস্তিত্বের দার্শনিক অন্বেষণ
মানুষ চিরকালই এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে — এই বিশ্বজগৎ আসলে কী? একটি
যান্ত্রিক কাঠামো, না কি কোনও গভীরতর অর্থবাহী সত্তা? এই প্রশ্নের উত্তরে বিভিন্ন সভ্যতা, বিভিন্ন
সময়, বিভিন্ন
ভাষায় প্রায় একই ইঙ্গিত রেখে গেছে — জগৎ মূলত সুরময়। সে কঠিন বস্তু নয়, বরং
প্রবহমান কম্পন; সে নীরব নয়, বরং নৈঃশব্দ্যের অন্তর্লীন সংগীত।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রিক দার্শনিক ও গণিতবিদ পিথাগোরাস প্রথম
এই সুরময় বিশ্বভাবনাকে সুসংহত রূপ দেন। তাঁর কাছে মহাবিশ্ব ছিল এক বিশাল
বাদ্যযন্ত্র, যেখানে গ্রহ-নক্ষত্রদের গতি এক ধরনের সংগীত সৃষ্টি করে — যাকে তিনি
নাম দেন Music of the Spheres। এই সংগীত কানে
শোনা যায় না, কিন্তু তা অস্তিত্বের গভীরে নিরন্তর বাজতে থাকে। পিথাগোরাসের দর্শনে
সংখ্যা, অনুপাত
ও সুর একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সংখ্যা থেকেই সুর, আর
সুর থেকেই গঠন পায় বিশ্বরূপ।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্রিং-তত্ত্ব যেন অজান্তেই এই প্রাচীন
অন্তর্দৃষ্টিকে নতুন ভাষায় ফিরিয়ে এনেছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জগতের
মৌলিক একক কোনও কঠিন কণা নয়, বরং অতি সূক্ষ্ম কম্পমান ‘স্ট্রিং’।
তাদের কম্পনের ভিন্নতায় সৃষ্টি হয় ভিন্ন ভিন্ন কণা, শক্তি ও রূপ।
অর্থাৎ, অস্তিত্বের
ভিত্তি কোনও বস্তু নয় — একটি কম্পনমাত্র। জগৎ তাই বস্তুজ নয়, সুরজ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের একটি গভীর দার্শনিক সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়
করায় — যদি জগতের মূল সত্য কম্পন হয়, তবে স্থিতি একটি ভ্রম। যা আমরা স্থির
বলে জানি, তা
আসলে এক বিশেষ ছন্দে চলমান। অস্তিত্ব মানে তাই থাকা নয়, বরং
বেজে চলা।
ভারতীয় দর্শনে এই উপলব্ধি আরও প্রাচীন ও আরও সূক্ষ্ম। সামবেদে বলা
হয়েছে — সমস্ত জগৎ সাত সুরের সংগীতপ্রবাহে বিধৃত। এখানে ‘সাত সুর’ কেবল সংগীতের
কারিগরি উপাদান নয়; তারা অস্তিত্বের সাতটি মৌলিক প্রকাশ। ভারতীয় চিন্তায় ‘নাদ’-ই ব্রহ্ম —
শব্দ নয়, বরং
শব্দেরও পূর্ববর্তী কম্পন। সেই নাদ থেকেই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের
আবর্তন।
রবীন্দ্রনাথ এই চিরন্তন ভাবনাকে আধুনিক কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করেছেন
‘বিশ্ব-বীণা’র রূপকে। তাঁর কাছে মহাবিশ্ব কোনও নির্বিকার যন্ত্র নয়; সে
এক সজীব বাদ্য, যার ঝংকারে নক্ষত্রলোক পর্যন্ত সুরে বাঁধা। কিন্তু সে সংগীত উচ্চকিত
নয় — সে নৈঃশব্দ্যের সংগীত। অর্থাৎ, প্রকৃত সুর কানে নয়, অনুভবে
ধরা দেয়।
এই নৈঃশব্দ্যের সংগীতের কথাই বলেন সুফি কবি রুমি। তাঁর ভাষায়, আমরা এমন এক স্থানে বাস করছি, যেখানে সবকিছুই সংগীত। মানুষ যদি সমস্ত বাদ্যযন্ত্র ধ্বংস করেও ফেলে, তবু সুর থামবে না — কারণ সুর মানুষের তৈরি নয়, মানুষই সুরের ভেতরে অবস্থিত। এখানে সংগীত আর শিল্প নয়; সংগীতই অস্তিত্বের ভাষা।
এই প্রসঙ্গে ‘Universe’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। Uni ও Verse — এক ও কবিতা।
অর্থাৎ, মহাবিশ্ব
একটি একক কবিতা। এই ধারণা আমাদের একটি সাহসী দার্শনিক সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায় —
স্রষ্টা যদি কবি হন, তবে সৃষ্টি কোনও নিছক কার্যকারণ-নির্ভর উৎপাদন নয়; সৃষ্টি
একটি নান্দনিক প্রকাশ। জগৎ তাই সমস্যার সমাধান নয়, জগৎ একটি রচনা, একটি মহাকাব্য।
এই মহাজাগতিক কবিতা ও সুরের সম্মিলনেই জন্ম নেয় আনন্দসংগীত — যা কোনও ব্যক্তিগত
আবেগ নয়, বরং
জগদাত্মার স্বরূপ। সেই আনন্দ সর্বত্র ধ্বনিত হচ্ছে। যখন তা অন্তরের তারে অনুরণিত
হয়, তখন তারে শোনা যায়। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেন — গানের ভিতর দিয়ে যখন ভুবনকে দেখি, তখনই
তাকে চেনা যায়। অর্থাৎ, জ্ঞান আসে বিশ্লেষণ থেকে নয়, অনুরণন থেকে।
এইখানেই সংগীতের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। সংগীত মানুষকে তথ্য দেয় না, সংগীত
মানুষকে রূপান্তরিত করে। সে মনকে বিশ্লেষণী অবস্থান থেকে সরিয়ে এনে একাত্মতার
স্তরে পৌঁছে দেয়। এই কারণেই প্রাচীনকাল থেকে সংগীত আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যম।
বাংলার বাউল ও বৈষ্ণব সাধকরা ঈশ্বরকে তত্ত্বে নয়, সুরে খোঁজেন।
তাঁদের কাছে ঈশ্বর কোনও দূরবর্তী সত্তা নন; তিনি অন্তরের তারে বেজে ওঠা সুর।
অতএব, সংগীত শোনা মানে কেবল বিনোদন নয় — সংগীত শোনা মানে অস্তিত্বের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নেওয়া। যখন মানুষের অন্তরের ছন্দ ও বিশ্বছন্দ এক হয়ে যায়, তখনই ঘটে সেই দুর্লভ মুহূর্ত — যেখানে জানা ও হওয়া একাকার হয়ে যায়। তখন আর ঈশ্বরকে খুঁজতে হয় না; কারণ মানুষ নিজেই সেই মহাজাগতিক সংগীতের একটি স্বর হয়ে ওঠে। ▣
