Posts

যুক্তিহীনতা — মননে ও সৃজনে

গ্রিক দার্শনিক Aristotle মানুষের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন — মানুষ একটি যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী। পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে এই সংজ্ঞা মানবসত্তার এক মৌলিক পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় — মানুষ কি সত্যিই সবসময় যুক্তির দ্বারা পরিচালিত ? নাকি সে কেবল নিজেকে যুক্তিবাদী বলে ভাবতে ভালবাসে ? আমরা যা করি , তা-ই আমাদের কাছে যুক্তিসঙ্গত বলে প্রতীয়মান হয় ; কারণ আমরা নিজের আচরণের পক্ষে নিজের মতো করে যুক্তি নির্মাণ করি । বাস্তবে যুক্তি অনেক সময় নিরপেক্ষ সত্যের মানদণ্ড নয় ; বরং তা ব্যক্তিস্বার্থ , অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। একজন আস্তিক যেমন ঈশ্বরবিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি খুঁজে পান , তেমনি নাস্তিকও তাঁর অবিশ্বাসের পক্ষে দৃঢ় যুক্তি হাজির করতে পারেন। একজন সাধু তাঁর ত্যাগের সপক্ষে যুক্তি দেন , আবার একজন উগ্রপন্থী তাঁর হিংসাকেও ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে যুক্তির আশ্রয় নেয়। ফলে যুক্তি হয়ে ওঠে আপেক্ষিক — ব্যক্তিভেদে যার রূপ বদলায়। একই ঘটনার পক্ষে ও বিপক্ষে সমান শক্তিশালী যুক্তি দাঁড় করানো সম্ভব হয়। কখনও কখনও মানুষ নিজের সুবিধামতো পরস্পরবিরোধী যুক্তিকেও গ্রহণ করে। এইভাবে যুক্তি...

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

Image
কোথাও আলো জ্বালাতে গেলে দেখা যায় — অন্ধকার যেন আগেই সেখানে এসে বসে আছে। তবে কি অন্ধকারের গতি আলোর চেয়েও বেশি ? না , তা নয়। আসলে আলোর যেমন গতি আছে , অন্ধকারের তেমন গতি নেই। কারণ অন্ধকার সর্বত্র , চিরন্তন। মহাকাশের শূন্যস্থান , যেখানে চোখে কিছুই দেখা যায় না , সেটিও আসলে ভরতি ‘ডার্ক এনার্জি’তে। তাই আলো জ্বালাতে হয় — অন্ধকার নয়। অন্ধকার নিজেই সর্বব্যাপী , শাশ্বত। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী , অন্ধকার অজ্ঞতার প্রতীক। কিন্তু নিশাচর প্যাঁচা যদি বলে , " অন্ধকারই তো জ্ঞান ও দূরদর্শিতার চিহ্ন ," — তবে ? প্রকৃতপক্ষে , অন্ধকার একরৈখিক নয় ; এর বহু রূপ , বহু মানে। কখনও তা ভয় জাগায় , কখনও প্রশান্তি দেয় ; কখনও তা বিশ্রামের , কখনও প্রণয়ের পরিপূর্ণ আবহ তৈরি করে। অন্ধকার এককভাবে শুভ বা অশুভ নয় , বিজ্ঞ বা অবিজ্ঞ নয় — যে যেমন চোখে দেখে , তার কাছে অন্ধকার তেমনই হয়ে ওঠে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অন্ধকারকে দেখেছিলেন এক মোহিনী রূপসী হিসেবে। তিনি লিখেছিলেন — “ হঠাৎ চোখের উপরে যেন সৌন্দর্যের তরঙ্গ খেলিয়া গেল। মনে হইল , কোন মিথ্যাবাদী প্রচার করিয়াছে — আলোরই রূপ , আঁধারের রূপ নাই ? ... এই যে আকাশ-বাতাস স্ব...

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

Image
আধ্যাত্মিকতার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘স্পিরিচুয়ালিটি’। বর্তমান যুগে পাশ্চাত্য দুনিয়ায় এই শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। যেমন — স্পিরিচুয়ালিটি অফ ওয়ার্ক , স্পিরিচুয়ালিটি অফ লাভ , স্পিরিচুয়ালিটি অফ ডেথ , স্পিরিচুয়ালিটি অফ ন্যাচার ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে — কী এই ‘স্পিরিচুয়ালিটি’ ? ‘ স্পিরিচুয়ালিটি’ শব্দটির অর্থ যুগে যুগে বিবর্তিত হয়েছে। এক সময় স্পিরিচুয়ালিটি বলতে বোঝানো হতো কেবলই ‘ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক’ ; কিন্তু আধুনিক কালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘অন্তরাত্মার সঙ্গে সম্পর্ক’ । ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত সপ্তদশ শতাব্দীর ফ্রান্সে এক নতুন আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটে , যা বিশেষভাবে অন্তরের গভীর অনুভূতিকে স্পিরিচুয়ালিটির সঙ্গে যুক্ত করে। তখন বলা হয় , ধর্ম ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার বিষয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গির্জার অনুশাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। তবে এটি অসাম্প্রদায়িক ছিল এবং নব্য-উদারপন্থী রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ । পরবর্তী সময়ে , আধ্যাত্মিক চেতনা আরও বিকশিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ‘নিউ এইজ স্পিরিচুয়ালিটি’ নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই আন্দোলন...

সোনালি অগ্রহায়ণ : নববর্ষের স্মৃতি, নবান্নের উৎসব

Image
‘ ও মা , অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি , আমার সোনার বাংলা। ’ — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ‘ সোনার বাংলা ’ -র কথা বলেছেন , তার সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ যেন ধরা পড়ে অঘ্রানের বাংলায়। কারণ অগ্রহায়ণ মাসেই বাংলার উর্বর মাটিতে সত্যিই সোনা ফলে — সোনালি ধানের রূপে। বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে তখন পাকা ধানের ঢেউ ওঠে ; দূর থেকে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই সোনালি আভরণ পরে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সোনালি পরিধান , মুখে মধুর হাসি — মায়ের এই অপরূপ রূপ দেখে বাঙালির হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে । অগ্রহায়ণ বাঙালির জীবনে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাস। মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাই বলেছিলেন — ধন্য অগ্রহায়ণ মাস , ধন্য অগ্রহায়ণ মাস , বিফল জনম তার , নাই যার চাষ । এই মাসেই কৃষক ঘরে তোলে বছরের প্রধান শস্য — আমন ধান। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর মাঠ থেকে গোলায় উঠে আসে ধান ; কৃষকের ঘরে ফিরে আসে এক বছরের আশ্বাস ও প্রাচুর্য। গ্রামবাংলার আকাশে তখন যেন উৎসবের সুর বাজতে থাকে। নতুন ধানের নতুন চাল দিয়ে তৈরি হয় পিঠা , পায়েস ও নানা মিষ্টান্ন। এই নব অন্নকে ঘিরেই জন্ম নেয় নবান্ন উৎসব — বাংলার কৃষিজীবনের অন্যতম আনন্দঘন উৎসব । অগ্রহায়ণের...