সোনালি অগ্রহায়ণ : নববর্ষের স্মৃতি, নবান্নের উৎসব

ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি, আমার সোনার বাংলা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সোনার বাংলা-র কথা বলেছেন, তার সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ যেন ধরা পড়ে অঘ্রানের বাংলায়। কারণ অগ্রহায়ণ মাসেই বাংলার উর্বর মাটিতে সত্যিই সোনা ফলে — সোনালি ধানের রূপে। বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে তখন পাকা ধানের ঢেউ ওঠে; দূর থেকে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই সোনালি আভরণ পরে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সোনালি পরিধান, মুখে মধুর হাসি — মায়ের এই অপরূপ রূপ দেখে বাঙালির হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে

golden paddy field

অগ্রহায়ণ বাঙালির জীবনে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাস। মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাই বলেছিলেন —

ধন্য অগ্রহায়ণ মাস, ধন্য অগ্রহায়ণ মাস,
বিফল জনম তার, নাই যার চাষ

এই মাসেই কৃষক ঘরে তোলে বছরের প্রধান শস্য — আমন ধান। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর মাঠ থেকে গোলায় উঠে আসে ধান; কৃষকের ঘরে ফিরে আসে এক বছরের আশ্বাস ও প্রাচুর্য। গ্রামবাংলার আকাশে তখন যেন উৎসবের সুর বাজতে থাকে। নতুন ধানের নতুন চাল দিয়ে তৈরি হয় পিঠা, পায়েস ও নানা মিষ্টান্ন। এই নব অন্নকে ঘিরেই জন্ম নেয় নবান্ন উৎসব বাংলার কৃষিজীবনের অন্যতম আনন্দঘন উৎসব

অগ্রহায়ণের গুরুত্ব শুধু কৃষিজীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা বর্ষপঞ্জির ইতিহাসও। একসময় অগ্রহায়ণই ছিল বছরের প্রথম মাস। নামের মধ্যেই সেই পরিচয় স্পষ্ট — ‘অগ্র’ অর্থ প্রথম, আর ‘হায়ন’ অর্থ বছর। অর্থাৎ বছরের সূচনাতেই যে মাস, তার নাম অগ্রহায়ণ। সেই কারণে এককালে বাংলার নববর্ষ উদযাপিত হতো পহেলা অগ্রহায়ণে

পরবর্তীকালে বৈশাখ মাস বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ইতিহাসবিদদের মতে, ৯৬৩ হিজরিতে যখন কৃষিকাজের সুবিধার্থে ‘ফসলি সন’ বা বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়, তখন হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের সময়কাল বৈশাখ মাসের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। এর ফলে ধীরে ধীরে বৈশাখই বর্ষপঞ্জির সূচনা-মাস হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং পহেলা বৈশাখ নববর্ষের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়

তবে প্রকৃতির দৃষ্টিতে বিচার করলে শরৎ, হেমন্ত কিংবা বসন্ত — এই ঋতুগুলোই নববর্ষ উদযাপনের জন্য বিশেষ উপযুক্ত। কারণ এই সময় প্রকৃতি ফুল, ফল ও শস্যে ভরপুর থাকে; চারদিকে থাকে প্রাচুর্য ও নবজীবনের আবহ। পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতেও এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়। পারসি সংস্কৃতিতে ‘নওরোজ’ নববর্ষ উদযাপিত হয় বসন্তের প্রথম দিনে, অর্থাৎ ভার্নাল ইকুইনক্সে। প্রায় তিন হাজার বছর ধরে এই ঐতিহ্য চলে আসছে

বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতিতেও বসন্তকেন্দ্রিক নববর্ষের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি উল্লেখ করেছেন যে প্রাচীনকালে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে নববর্ষের উৎসব পালিত হত। দোলযাত্রা বা হোলি উৎসব সেই প্রাচীন নববর্ষোৎসবেরই স্মৃতি বহন করে বলে তিনি মনে করেন

কালের স্রোতে বর্ষপঞ্জির রীতি বদলেছে, নববর্ষের দিনও স্থানান্তরিত হয়েছে তবু অগ্রহায়ণ তার স্মৃতিকে হারায়নি যে মাস একদিন ছিল বছরের প্রথম প্রভাত, আজ সেই সময়েই বাংলার ঘরে ঘরে উদযাপিত হয় নবান্ন নতুন অন্নের উৎসব যেন ইতিহাসের এক প্রাচীন আলোকরেখা এখনও বাংলার মাটিতে নীরবে জ্বলজ্বল করে

আসলে অগ্রহায়ণ কেবল একটি মাস নয়; এটি মানুষের শ্রম ও প্রকৃতির দানের মিলিত উৎসব বীজ বোনা থেকে শস্য ঘরে তোলা এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার মধ্যে লুকিয়ে থাকে মানুষের আশা, ধৈর্য ও বিশ্বাস তাই নবান্নের আনন্দ শুধু খাদ্যের আনন্দ নয়; এটি মানুষের পরিশ্রমের সার্থকতা এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতার এক আন্তরিক প্রকাশ

হেমন্তের নরম বাতাসে যখন সোনালি ধানের ঢেউ দুলে ওঠে, তখন মনে হয় যেন বাংলার মাটি নিজেই হাসছে সেই হাসির মধ্যেই ধরা পড়ে জীবনের এক গভীর দর্শন ক্ষয় আর সৃষ্টির চিরন্তন চক্র বীজ মাটিতে হারিয়ে যায় বলেই ফসল ফিরে আসে; সমাপ্তির মধ্যেই তাই লুকিয়ে থাকে নতুন সূচনার সম্ভাবনা

সেই জন্যই অগ্রহায়ণের নবান্ন শুধু শস্যের উৎসব নয়; এটি জীবনেরও উৎসব বাংলার মাঠে মাঠে সোনালি ধান দুলতে দুলতে যেন আজও বলে যায় জীবন বারবার ফিরে আসে, নতুন হয়ে, প্রাচুর্যের হাসি নিয়ে আর সেই হাসির মধ্যেই অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকে বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার সোনালি অগ্রহায়ণ 


অসীম দে
গুয়েল্ফ, অন্টারিও, কানাডা 

Popular posts from this blog

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ চেনার উপায়

সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ — সৃষ্টিতত্ত্বের মূলভাব

অমাবস্যা ও পূর্ণিমা : চন্দ্রসূর্যের মিলন ও বিরহ তিথি

তেলের সামাজিক মাহাত্ম্য

ঈশ্বর, প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

রাসলীলা : অন্তরলীলার মহিমা

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

সূর্য উপাসনা

হৃদয়-দর্পনে দেখা