Posts

নিশ্চন্দ্র জ্যোৎস্না

প্রতি বছরের জুন মাসের ২০ থেকে ২২ তারিখের মধ্যে কোনও এক দিনে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে সর্বাধিক হেলে পড়ে। এই দিনটি ‘সামার সলস্টিস’ বা উত্তরায়ণান্ত নামে পরিচিত — উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মের সূচনার এক উজ্জ্বল দিগন্তচিহ্ন । এই সময়কে কেন্দ্র করে , কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে কয়েক সপ্তাহ পরে পর্যন্ত বিষুবরেখার উত্তরে আনুমানিক ৪৯ ° থেকে ৬৫.৫ ° অক্ষাংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে সূর্যাস্ত হয় অনেক দেরিতে , সূর্যোদয় ঘটে খুব তাড়াতাড়ি ; ফলে রাত কখনও সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে না। সূর্য দিগন্তের নিচে ডুব দেয় ঠিকই , কিন্তু সেই অন্তর্ধান ক্ষণস্থায়ী — অল্প সময়ের মধ্যেই ভোরের আলো ফিরে আসে। তাই রাত্রি জুড়ে ছড়িয়ে থাকে এক মৃদু , স্বচ্ছ আলোকচ্ছটা — পূর্ণিমার মতো উজ্জ্বল , অথচ আরও কোমল ও রহস্যময়। এই ঘটনাই ‘শ্বেত রাত্রি’ নামে পরিচিত । আরও উত্তরে , প্রায় ৬৫.৫ ° থেকে ৬৭.৫ ° অক্ষাংশের মধ্যে , এই বিস্ময় আরও তীব্র হয়ে ওঠে। উত্তরায়ণান্তের সময়কে কেন্দ্র করে বহুদিন ধরে সূর্য আর সম্পূর্ণভাবে অস্ত যায় না ; দিগন্ত স্পর্শ করেই যেন ফিরে আসে। সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের মধ্যে ঘ...

ব্লক ইউনিভার্স — এক ক্রিয়াকালহীন মহাবিশ্বের নাম

Image
কবি বলেছেন , ‘ কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন ’ । সময় যেন এক নদী , যা নিরন্তর প্রবাহিত হয় ভবিষ্যৎ থেকে বর্তমান হয়ে অতীতের দিকে । আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় সময়ের এই গতিময়তা অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হলেও , পদার্থবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে একমত নন । তাঁরা মনে করেন , সময় প্রবাহিত হওয়ার চেয়ে বরং একটি স্থায়ী কাঠামো । সময় গতিশীল হওয়ার ধারণায় সমস্যা কোথায় ? সময়কে যদি গতিশীল বলে ধরা হয় , তবে স্বভাবিক প্রশ্ন উঠবে: সময়ের গতি কত ? সময় যদি সত্যিই চলমান হয় , তাহলে তা মাপার জন্য আমাদের প্রয়োজন একটি ‘ প্রসঙ্গ সময় ’ বা রেফারেন্স টাইম । যেমন  নদীর গতি নির্ধারিত হয় তার দুই তীরের সাপেক্ষে । কিন্তু সময়ের ক্ষেত্রে এমন কোনও তীর নেই । সুতরাং , যদি সময় নিজের সাপেক্ষেই প্রবাহিত হয় , তবে এর গতি দাঁড়াবে সেকেন্ড/সেকেন্ড । অর্থাত্‍ , এক সেকেন্ডে সময় এক সেকেন্ড পথ অতিক্রম করছে , যা অর্থহীন । এছাড়া , মহাবিশ্বের বাইরে এমন কোনও ঘড়ি বা মানদন্ড নেই যার সাহায্যে সময়ের চলমানতাকে যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। ফলে , বিজ্ঞানীরা মনে করেন , সময় গতিশীল নয় ; বরং একটি স্থির কাঠামোতে অবস্থিত , যেখানে ঘটনাসমূহ স্থায়ীভাব...

অমৃতের অন্বেষা ও আধ্যাত্মিক অমরতা

মানুষ চিরকালই অমরত্বের সন্ধানে মগ্ন থেকেছে। কিন্তু সেই অমৃতরস , যা পান করে মানুষ অমর হতে পারে , তা কি আদৌ কোথাও পাওয়া গেছে ? প্রকৃতপক্ষে , মানুষের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তার অস্তিত্বের স্ববিরোধী বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন । মানুষের টিকে থাকা ও অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা পৃথিবীতে মানুষের টিকে থাকার কথা ছিল না বললেই চলে। জন্মের সময় মানুষ অসহায় শিশু ; পিতা-মাতার স্নেহ-সুরক্ষা ছাড়া তার বাঁচা সম্ভব নয়। পশুদের মতো মানুষের দেহে নেই শক্ত বহিরাবরণ , পশম বা আঁশ , যা তাকে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করতে পারে। পূর্ণবয়স্ক মানুষও বাঘ বা সিংহের মতো দ্রুতগতিতে দৌড়াতে পারে না , তার দাঁত-নখও যথেষ্ট প্রতিরক্ষামূলক নয়। তবু মানুষ টিকে গেছে এবং বিকশিত হয়েছে তার বুদ্ধিমত্তার জন্য । মানুষের বুদ্ধিমত্তার জোরেই অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছে। তবে বিজ্ঞান দেখিয়েছে , এ আকাঙ্ক্ষা কেবল কল্পনারই রূপ। ফিলাডেলফিয়ার বিজ্ঞানী লেওনার্দ হেইফ্লিক প্রমাণ করেছেন যে মানুষের দেহকোষ সীমিত সংখ্যকবার বিভাজিত হতে পারে—এই সীমাকে বলা হয় ‘ হেইফ্লিক লিমিট’ । একসময় কোষ বিভাজন থেমে যায় এবং কোষ মারা যায়। অথচ যদি কোষ এই সীমা অতিক্রম করে বিভাজন ...

যুক্তিহীনতা — মননে ও সৃজনে

গ্রিক দার্শনিক Aristotle মানুষের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন — মানুষ একটি যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী। পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে এই সংজ্ঞা মানবসত্তার এক মৌলিক পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় — মানুষ কি সত্যিই সবসময় যুক্তির দ্বারা পরিচালিত ? নাকি সে কেবল নিজেকে যুক্তিবাদী বলে ভাবতে ভালবাসে ? আমরা যা করি , তা-ই আমাদের কাছে যুক্তিসঙ্গত বলে প্রতীয়মান হয় ; কারণ আমরা নিজের আচরণের পক্ষে নিজের মতো করে যুক্তি নির্মাণ করি । বাস্তবে যুক্তি অনেক সময় নিরপেক্ষ সত্যের মানদণ্ড নয় ; বরং তা ব্যক্তিস্বার্থ , অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। একজন আস্তিক যেমন ঈশ্বরবিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি খুঁজে পান , তেমনি নাস্তিকও তাঁর অবিশ্বাসের পক্ষে দৃঢ় যুক্তি হাজির করতে পারেন। একজন সাধু তাঁর ত্যাগের সপক্ষে যুক্তি দেন , আবার একজন উগ্রপন্থী তাঁর হিংসাকেও ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে যুক্তির আশ্রয় নেয়। ফলে যুক্তি হয়ে ওঠে আপেক্ষিক — ব্যক্তিভেদে যার রূপ বদলায়। একই ঘটনার পক্ষে ও বিপক্ষে সমান শক্তিশালী যুক্তি দাঁড় করানো সম্ভব হয়। কখনও কখনও মানুষ নিজের সুবিধামতো পরস্পরবিরোধী যুক্তিকেও গ্রহণ করে। এইভাবে যুক্তি...

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

Image
কোথাও আলো জ্বালাতে গেলে দেখা যায় — অন্ধকার যেন আগেই সেখানে এসে বসে আছে। তবে কি অন্ধকারের গতি আলোর চেয়েও বেশি ? না , তা নয়। আসলে আলোর যেমন গতি আছে , অন্ধকারের তেমন গতি নেই। কারণ অন্ধকার সর্বত্র , চিরন্তন। মহাকাশের শূন্যস্থান , যেখানে চোখে কিছুই দেখা যায় না , সেটিও আসলে ভরতি ‘ডার্ক এনার্জি’তে। তাই আলো জ্বালাতে হয় — অন্ধকার নয়। অন্ধকার নিজেই সর্বব্যাপী , শাশ্বত। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী , অন্ধকার অজ্ঞতার প্রতীক। কিন্তু নিশাচর প্যাঁচা যদি বলে , " অন্ধকারই তো জ্ঞান ও দূরদর্শিতার চিহ্ন ," — তবে ? প্রকৃতপক্ষে , অন্ধকার একরৈখিক নয় ; এর বহু রূপ , বহু মানে। কখনও তা ভয় জাগায় , কখনও প্রশান্তি দেয় ; কখনও তা বিশ্রামের , কখনও প্রণয়ের পরিপূর্ণ আবহ তৈরি করে। অন্ধকার এককভাবে শুভ বা অশুভ নয় , বিজ্ঞ বা অবিজ্ঞ নয় — যে যেমন চোখে দেখে , তার কাছে অন্ধকার তেমনই হয়ে ওঠে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অন্ধকারকে দেখেছিলেন এক মোহিনী রূপসী হিসেবে। তিনি লিখেছিলেন — “ হঠাৎ চোখের উপরে যেন সৌন্দর্যের তরঙ্গ খেলিয়া গেল। মনে হইল , কোন মিথ্যাবাদী প্রচার করিয়াছে — আলোরই রূপ , আঁধারের রূপ নাই ? ... এই যে আকাশ-বাতাস স্ব...