নিশ্চন্দ্র জ্যোৎস্না

প্রতি বছরের জুন মাসের ২০ থেকে ২২ তারিখের মধ্যে কোনও এক দিনে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে সর্বাধিক হেলে পড়ে। এই দিনটি ‘সামার সলস্টিস’ বা উত্তরায়ণান্ত নামে পরিচিত — উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মের সূচনার এক উজ্জ্বল দিগন্তচিহ্ন

এই সময়কে কেন্দ্র করে, কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে কয়েক সপ্তাহ পরে পর্যন্ত বিষুবরেখার উত্তরে আনুমানিক ৪৯° থেকে ৬৫.৫° অক্ষাংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে সূর্যাস্ত হয় অনেক দেরিতে, সূর্যোদয় ঘটে খুব তাড়াতাড়ি; ফলে রাত কখনও সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে না। সূর্য দিগন্তের নিচে ডুব দেয় ঠিকই, কিন্তু সেই অন্তর্ধান ক্ষণস্থায়ী — অল্প সময়ের মধ্যেই ভোরের আলো ফিরে আসে। তাই রাত্রি জুড়ে ছড়িয়ে থাকে এক মৃদু, স্বচ্ছ আলোকচ্ছটা — পূর্ণিমার মতো উজ্জ্বল, অথচ আরও কোমল ও রহস্যময়। এই ঘটনাই ‘শ্বেত রাত্রি’ নামে পরিচিত

আরও উত্তরে, প্রায় ৬৫.৫° থেকে ৬৭.৫° অক্ষাংশের মধ্যে, এই বিস্ময় আরও তীব্র হয়ে ওঠে। উত্তরায়ণান্তের সময়কে কেন্দ্র করে বহুদিন ধরে সূর্য আর সম্পূর্ণভাবে অস্ত যায় না; দিগন্ত স্পর্শ করেই যেন ফিরে আসে। সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের মধ্যে ঘটে এক অনবচ্ছিন্ন মিলন, দিন ও রাতের সীমানা বিলীন হয়ে যায়। পৃথিবী তখন নিমগ্ন থাকে একটানা দিবালোকে। এই ঘটনাই ‘মধ্যরাত্রির সূর্য’ নামে পরিচিত। ইকালুইট এই অপূর্ব দৃশ্যের জন্য সুপরিচিত এক উত্তরাঞ্চলীয় নগর

অন্যদিকে, সেন্ট পিটার্সবার্গশ্বেত রাত্রি’র জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। উত্তরায়ণান্তের সময় সেখানে সূর্য অস্ত যায় প্রায় রাত দশটার দিকে এবং উদিত হয় রাত তিনটার মধ্যেই। এই স্বল্প ব্যবধানের রাত্রি কখনও গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয় না; বরং গোধূলির স্নিগ্ধ, মায়াময় আলোয় ভরে থাকে চারদিক

শ্বেত রাত্রি’ আসলে প্রভাত ও সাঁঝ — এই দুই গোধূলির অপূর্ব সম্মিলন। অস্তরাগের রক্তিম আভা আর উষারাগের কোমল দীপ্তি মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অনির্বচনীয় আবহ — যেন চাঁদহীন এক জ্যোৎস্না, নিশ্চন্দ্র অথচ আলোকময়। সেই অলৌকিক আলোয় রাত্রি ধারণ করে এক মায়াবী মোহিনী-রূপ, যেখানে অন্ধকার ও আলোর সীমারেখা নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যায় 


✍অসীম দে
গুয়েল্ফ, অন্টারিও, কানাডা

Popular posts from this blog

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ চেনার উপায়

সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ — সৃষ্টিতত্ত্বের মূলভাব

অমাবস্যা ও পূর্ণিমা : চন্দ্রসূর্যের মিলন ও বিরহ তিথি

তেলের সামাজিক মাহাত্ম্য

ঈশ্বর, প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

রাসলীলা : অন্তরলীলার মহিমা

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

সূর্য উপাসনা

হৃদয়-দর্পনে দেখা