Posts

অকারণ সুখ : অন্তরের পরিপূর্ণতা

Image
সুখ — মনের এমন এক অবস্থা , যা সবাই কামনা করে। সুস্থতা , স্বাচ্ছন্দ্য , আনন্দ , ভালবাসা ও তৃপ্তির মতো ইতিবাচক অনুভূতিগুলোর সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ নানাভাবে সুখ অনুভব করতে পারে — লক্ষ্য অর্জন , ইচ্ছাপূরণ , সুসংবাদ পাওয়া কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো ইত্যাদি তার কিছু সাধারণ মাধ্যম। তবে , কিছু সময় কোনও বাহ্যিক কারণ ছাড়াই মানুষ সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করে , যা অকারণ-সুখ নামে পরিচিত । সাধারণভাবে , মানুষ মনে করে — ' আমি সুখী হব , যদি যা চাই তা পাই এবং যা চাই না তা এড়িয়ে চলতে পারি। ’ এ ধরনের সুখ নির্ভরশীল ও শর্তযুক্ত , যা আসলে এক মরীচিকা। কারণ , আকাঙ্ক্ষার কোনও শেষ নেই ; একটির পর আরেকটি চাওয়া সামনে এসে দাঁড়ায় , ফলে সুখ অধরা থেকে যায়। পক্ষান্তরে , অকারণ-সুখ নিঃশর্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত , যা মানুষের অন্তর্নিহিত স্বাভাবিক অবস্থা । আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক বিনিময়ে আমরা জিজ্ঞেস করি — ‘ কেমন আছেন ? ’ যদি কেউ উত্তর দেয় , ‘ ভাল আছি ’ , সাধারণত আমরা আর জানতে চাই না — কেন ভাল আছেন ? সুখ ও সুস্থতা আমাদের স্বাভাবিক অবস্থা বলেই এ প্রশ্ন অবান্তর মনে হয়। কিন্তু কেউ যদি বলে , ‘ ভাল নেই ’ , তখন তার ...

ময়ূরের সৌন্দর্য ও বিবর্তনের রহস্য

Image
জীবজগতে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন প্রাণীদের মধ্যে ময়ূর অন্যতম। ময়ূর যখন তার বিচিত্রবর্ণের পাখা মেলে ধরে , তখন তা এক অপার বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ময়ূরের সৌন্দর্যের মূল রহস্য তার জমকালো বহুবর্ণা লেজ বা পুচ্ছ। তবে এই পুচ্ছ তার দেহের তুলনায় অত্যন্ত ভারী , যা সম্ভবত তাকে উড়তে বাধা দেয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় টুনটুনি পাখি ময়ূরের ভারী লেজ নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছিল: ‘ রে ময়ূর , তোকে দেখে করুণায় মোর জল আসে চোখে। … আমি দেখো লঘুভারে ফিরি দিনরাত , তোমার পশ্চাতে পুচ্ছ বিষম উৎপাত । ’ তবে ময়ূর পাল্টা যুক্তি দেয় যে , ভার থাকলেই তা উৎপাত হয় না , বরং গৌরবের প্রতীকও হতে পারে । ডারউইনের দৃষ্টিভঙ্গি ও যৌন নির্বাচন তত্ত্ব বিবর্তন তত্ত্বের প্রবক্তা চার্লস ডারউইন ময়ূরের পুচ্ছ সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। তিনি ময়ূরপুচ্ছ এতটাই অপছন্দ করতেন যে , এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন , ‘ যখনই ময়ূরপুচ্ছের পালকের দিকে তাকাই , আমার বমি-বমি ভাব হয়। ’ তার বিবর্তন তত্ত্ব অনুসারে , প্রাণীর প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের উপযোগিতা থাকা উচিত। কিন্তু ময়ূরের পুচ্ছ দেখে তিনি বিভ্রান্ত হন , কারণ এটি কোনওভাবেই টিকে থাকার লড়াইয়ে সুবিধা দেয় না , বর...

বাক্-দেবী সরস্বতী: শব্দের অন্তরালে এক দীপ্ত প্রতিমা

Image
মানুষ কথা বলে — এ তো আমাদের জানা। কিন্তু এই ‘কথা বলা’ই তাকে অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা করে দেয়। পশু-পাখিরাও ধ্বনি সৃষ্টি করে , যোগাযোগের চেষ্টা করে বটে , তবে তা ভাষা নয়। তারা ‘ধ্বনি’ করে , কিন্তু তা দিয়ে গড়ে তুলতে পারে না অর্থবোধক শব্দ বা বাক্য। মানুষের মতো স্পষ্ট উচ্চারণ , চিন্তনক্ষমতা ও জটিল ভাব প্রকাশ তাদের আয়ত্তে নেই । কথা বলার ক্ষমতা মানুষের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই ক্ষমতার উৎস এক জটিল শারীরবৃত্তীয় কাঠামো — বাক্-যন্ত্র। এটি কোনও একক অঙ্গ নয় , বরং বহু অঙ্গের সম্মিলিত কর্মযজ্ঞ। ফুসফুসের বাতাস , কণ্ঠনালির স্বর , মুখগহ্বরের প্রতিসরণ , জিহ্বার গতি , ঠোঁটের নাচন , দাঁত ও নাসারন্ধ্রের সহযোগিতায় যে শব্দ উৎপন্ন হয় , তা-ই রূপ নেয় বাক্যে , ভাষায়। শব্দ যেন মানুষের শরীরের ভেতরে এক নিখুঁত সুরলিপির মতো জন্ম নেয় , আর উচ্চারণে মূর্ত হয় । তবে প্রশ্ন থেকে যায় — এই বিস্ময়কর ক্ষমতা কি নিছক প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফসল ? অনেক বিবর্তনবাদী বলবেন , হ্যাঁ — এটি দীর্ঘকালীন বিবর্তনেরই ফল। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন , এত সূক্ষ্ম এবং অর্থবহ এক ব্যবস্থার পেছনে কেবল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নয় , থাকতে পারে কোনও ...

হৃদয়-দর্পনে দেখা

Image
মানুষ নিজের মুখ নিজের চোখে দেখতে পারে না। আয়নায় যে মুখাবয়ব ধরা পড়ে , তা আসলে প্রতিবিম্ব — বাস্তবের একটি উল্টো , নির্জীব প্রতিলিপি। রবীন্দ্রনাথ Stray Birds - এ বলেছেন , “What you are you do not see; what you see is your shadow.” অর্থাৎ আমরা যা , তা আমাদের দৃষ্টির বাইরে ; চোখে পড়ে কেবল তার ছায়া । নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কেও এই কথাই সত্য। যতক্ষণ না তা অন্য কোথাও প্রতিফলিত হয়ে আমাদের সামনে আসে , ততক্ষণ আমরা তাকে চিনতে পারি না। তাই নিজের সৌন্দর্য দেখার জন্য প্রয়োজন হয় একটি প্রতিফলক। সেই প্রতিফলক হতে পারে আয়না — যা আলো ফেরত দেয়। কিন্তু আয়নায় আমরা আসলে কী দেখি ? যা আমরা সত্যিই , নাকি যা হতে চাই ? এই দেখাটা কি সম্পূর্ণ , নির্ভুল ? আয়না আবিষ্কারের বহু আগে মানুষ শান্ত দিঘির জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বিস্মিত হতো। চৈতন্যচরিতামৃতে আছে , পুষ্করিণীর স্বচ্ছ জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কৃষ্ণ বিস্ময়ে বলছেন — অপরিকলিতপূর্বঃ কশ্চমৎকারকারী… আমি এত সুন্দর! এই আশ্চর্য মধুরতা আমি আগে কখনও দেখিনি। সত্যি বলতে কী , এখন আমার মনে এই মাধুর্য আস্বাদন করার প্রবল ইচ্ছে জেগেছে। কিন্তু প্রতিবিম্ব তো আস্বাদন করা যায় না...