Posts

অসহায় কেন মানবশিশু

Image
মানবশিশু পৃথিবীতে আসে এক গভীর বৈপরীত্য নিয়ে — অসীম সম্ভাবনার বাহক , অথচ জন্মমুহূর্তে সম্পূর্ণ অসহায়। শারীরিক ও মানসিকভাবে সে অপরিণত ; নিজের আহার , চলাফেরা , এমনকী আত্মরক্ষার ন্যূনতম সামর্থ্যও তার নেই। অন্যদিকে বহু প্রাণী জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে। একটি হরিণশাবক জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যেই দাঁড়িয়ে দৌড়াতে পারে ; একটি বিড়ালছানা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শিকার ধরতে শেখে। তাহলে মানুষ — যে নিজেকে জ্ঞানী ও সংস্কৃতিমান প্রাণী বলে গর্ব করে — তার সন্তান এত দীর্ঘকাল অসহায় থাকে কেন ? দ্য প্রপোরশনস অব দ্য হেড/লেওনার্দো দা ভিঞ্চি বিজ্ঞানীদের মতে , এর মূল কারণ মানুষের বৃহৎ মস্তিষ্ক। বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষের মস্তিষ্কের আকার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের নিকটতম আত্মীয় chimpanzee- এর গড় মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ৩৮০ গ্রাম , অথচ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের গড় ওজন প্রায় ১ , ৩০০–১ , ৪০০ গ্রাম। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় তিনগুণ বড়। ধারণা করা হয় , বিশেষত ৮ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ বছর আগে মানবমস্তিষ্কের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধি মানুষকে দিয়েছে ভাষা , বিমূর্ত চিন্তা ,...

আমিই সে — আমিই পরম সত্য

Image
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মানুষ আজ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। তবু কি আধুনিক মানুষ নিজেকে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্তা হিসেবে ঘোষণা করতে পেরেছে ? অথচ হাজার বছর আগে উপনিষদের ঋষিরা সূর্যকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন , ‘ হে দীপ্তিমান সূর্য , আমি সেই পুরুষ , যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। ’ এই উক্তি থেকেই এসেছে ‘ সোহম্ ’ বা ‘ সোহং ’ , যার অর্থ , ‘ আমিই সে ’ বা ‘ I am That’ । যীশু খ্রীস্ট বলেছিলেন , ‘ আব্রাহামের আগে আমিই ছিলাম ’ এবং ‘ আমি আর পিতা এক ’ । পারস্যের সুফি সাধক মানসুর আল-হাল্লাজ ধ্যানমগ্ন অবস্থায় উচ্চারণ করেছিলেন ‘ আনাল হাক্ক ’ , অর্থাৎ ‘ আমিই পরম সত্য ’ । বাংলার বাউল কবি হাসন রাজার গানে পাওয়া যায় , ‘ হাসন রাজায় জিজ্ঞাস করে , কানাইয়া কোন জন। ভাবনা চিন্তা কইরা দেখি , কানাই যে হাসন। ’ অর্থাৎ , ‘ আমিই কানাই , আমিই ঈশ্বর। ’ যদি কেউ আজ বলে , ‘ আমিই ঈশ্বর ’ , তাহলে তাকে হয়তো অজ্ঞ বা অহংকারী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যাঁরা এসব কথা বলেছিলেন , তাঁরা অজ্ঞ বা অহংকারী ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন দিব্যজ্ঞানী সাধক , যাঁদের সাধনার মূল লক্ষ্য ছিল অহংকার ত্যাগ করে নিজেকে পরম সত...

বাউল ভাব : অন্তর্গত ঈশ্বরের আরাধনা

Image
আমরা যখন সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে প্রার্থনা করি বা অর্ঘ্য নিবেদন করি , অজান্তেই দৃষ্টি উঠে যায় আকাশের দিকে — যেন আমাদের মাথার ওপরের সেই অনন্ত নীলেই তাঁর নিবাস। কিন্তু আকাশ তো সর্বত্র বিস্তৃত ; পৃথিবী ঘুরছে , আর সেই সঙ্গে আমাদের দৃষ্টির আকাশও প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল আকাশের মধ্যে তবে কোন দিকে স্থির করব তাঁর অবস্থান ? কোথায় নিবেদন করব আমাদের ভক্তি , কোথায় পৌঁছাবে আমাদের প্রার্থনা , আর কোথায়ই বা তাঁর প্রকৃত বাস ? এই প্রশ্নের উত্তরে একটি প্রাচীন কাহিনি শোনা যায়। বলা হয় , সৃষ্টির আদিযুগে ঈশ্বর মানুষের রূপ ধারণ করে মানুষের মাঝেই বাস করতেন। মানুষের ভক্তি , ভালবাসা ও সান্নিধ্যে তিনি পরিতৃপ্ত হয়ে দিন কাটাতেন। কিন্তু ক্রমে এক জটিলতা দেখা দিল — মানুষের অন্তহীন চাহিদা। একটি পূরণ হলেই আরেকটি এসে উপস্থিত ; প্রার্থনার যেন শেষ নেই। যদিও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পক্ষে সব পূরণ করা অসম্ভব ছিল না , তবু সমস্যার মূল ছিল অন্যত্র । সমস্যা ছিল মানুষের ইচ্ছার পারস্পরিক বিরোধে। একজন কৃষক প্রার্থনা করল বৃষ্টির জন্য — খরায় ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ; ঈশ্বর বৃষ্টি দিলেন। কিন্তু সেই বৃষ্টিতে অন্য এক ...

অলটেয়ার ও ভেগা: দুই নক্ষত্রের মিলন ও বিরহ

Image
আপনি যদি এমন কোনও স্থানে বসবাস করেন , যেখানে রাতের আকাশ আলোক দূষণমুক্ত ও নিখাদ অন্ধকার , তাহলে নিশ্চয়ই দেখেছেন — আকাশজুড়ে ধূসরাভ একটি আলোকছায়ার বন্ধনী প্রসারিত হয়ে আছে। এটি আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি — মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ । এই ছায়াপথে রয়েছে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র , প্রতিটি এক একটি অগ্নিময় অস্তিত্ব , দূর আকাশের নিঃসীম নিস্তব্ধতায় ছড়িয়ে আছে। কিন্তু পৃথিবী থেকে তাদের একত্রে দেখলে তারা যেন গলে মিশে এক আশ্চর্য আলোর নদীতে রূপ নেয়। এই আলোর প্রবাহই বহু প্রাচীন সংস্কৃতিতে একটি স্বর্গীয় নদী রূপে কল্পিত হয়েছে — চিনে ‘ইন হে’ (রুপালি নদী) , জাপানে ‘আমানোগাওয়া’ (স্বর্গের নদী) , আর ভারতে — ‘আকাশগঙ্গা’ । এই আকাশগঙ্গার দুই তীরে আলো ছড়িয়ে থাকে দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র — ভেগা (অভিজিৎ) ও অলটেয়ার (শ্রবণা) । কিন্তু তারা শুধু জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু নয় , বরং মানবমনের চিরন্তন প্রেম-তৃষ্ণার প্রতীক । আকাশগঙ্গা / ভেগা / অলটেয়ার চিরায়ত এক প্রেমকাহিনি প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে চিনে জন্ম নেয় এক লোককাহিনি। তাতে বলা হয় , ভেগা ও অলটেয়ার দুই মানবসন্তানের প্রতীক — জানু ও নিওলাং। জানু এক বয়নকন্যা ...