অসহায় কেন মানবশিশু

মানবশিশু পৃথিবীতে আসে এক গভীর বৈপরীত্য নিয়ে — অসীম সম্ভাবনার বাহক, অথচ জন্মমুহূর্তে সম্পূর্ণ অসহায়। শারীরিক ও মানসিকভাবে সে অপরিণত; নিজের আহার, চলাফেরা, এমনকী আত্মরক্ষার ন্যূনতম সামর্থ্যও তার নেই। অন্যদিকে বহু প্রাণী জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে। একটি হরিণশাবক জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যেই দাঁড়িয়ে দৌড়াতে পারে; একটি বিড়ালছানা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শিকার ধরতে শেখে। তাহলে মানুষ — যে নিজেকে জ্ঞানী ও সংস্কৃতিমান প্রাণী বলে গর্ব করে — তার সন্তান এত দীর্ঘকাল অসহায় থাকে কেন?

proportions of the head by leonardo da vinci
দ্য প্রপোরশনস অব দ্য হেড/লেওনার্দো দা ভিঞ্চি

বিজ্ঞানীদের মতে, এর মূল কারণ মানুষের বৃহৎ মস্তিষ্ক। বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষের মস্তিষ্কের আকার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের নিকটতম আত্মীয় chimpanzee-এর গড় মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ৩৮০ গ্রাম, অথচ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের গড় ওজন প্রায় ১,৩০০–১,৪০০ গ্রাম। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় তিনগুণ বড়। ধারণা করা হয়, বিশেষত ৮ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ বছর আগে মানবমস্তিষ্কের আকার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধি মানুষকে দিয়েছে ভাষা, বিমূর্ত চিন্তা, কল্পনা, পরিকল্পনা ও সৃজনশীলতার অসাধারণ ক্ষমতা

কিন্তু এই প্রাপ্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক জৈবিক সংকট। মানুষের মস্তিষ্ক যত বড় হয়েছে, মাথার খুলি বা করোটিও তত বিস্তৃত হয়েছে। অন্যদিকে, মানুষের দেহকাঠামো বিবর্তিত হয়েছে দ্বিপদী চলাচলের উপযোগী করে — অর্থাত্‍ দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটার জন্য। এই ভঙ্গিমা মানুষের শ্রোণীচক্রকে (pelvic ring) এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যাতে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়; কিন্তু একই সঙ্গে জন্মপথ অতিরিক্ত প্রশস্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়েছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক জটিল দ্বন্দ্ব — বৃহৎ মাথাবিশিষ্ট ভ্রূণ এবং তুলনামূলক সংকীর্ণ জন্মদ্বার

এই দ্বন্দ্বের সমাধান হয়েছে এক বিশেষ উপায়ে: মানবশিশু জন্ম নেয় পূর্ণ পরিণতির আগেই। অর্থাৎ, তার মস্তিষ্ক জন্মের সময় সম্পূর্ণ বিকশিত থাকে না; জন্মের পর বহু বছর ধরে তা বিকশিত হতে থাকে। অন্যান্য বহু স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে জন্ম-পরবর্তী বিকাশের বড় অংশ গর্ভেই সম্পন্ন হয়, কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে বিকাশের একটি দীর্ঘ অধ্যায় শুরু হয় জন্মের পর। ফলে মানবশিশু দীর্ঘকাল নির্ভরশীল থাকে পিতামাতার উপর

বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানীরা একে obstetric dilemma’ নামে অভিহিত করেন — প্রসব-সংকটের দ্বৈততা। বৃহৎ মস্তিষ্কের প্রয়োজন এবং সংকীর্ণ শ্রোণীচক্রের সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই দ্বন্দ্ব মানবজাতির ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মানুষের শৈশব তাই দীর্ঘ; এই দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্বে সে শেখে ভাষা, নৈতিকতা, সামাজিকতা, সংস্কৃতি। এই দীর্ঘ নির্ভরতাই পরিবারব্যবস্থা, সহযোগিতা ও সম্মিলিত লালনপালনের ভিত্তি স্থাপন করেছে

তবে বিষয়টি কেবল জৈবিক নয়; এর একটি দার্শনিক মাত্রাও আছে। যদি আমরা সৃষ্টিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি — অর্থাৎ বিশ্বাস করি মানুষ ঈশ্বর-নির্মিত — তাহলে প্রশ্ন ওঠে: এই আপাত অপূর্ণতা কি সত্যিই ত্রুটি? নাকি এটি এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ? মানবশিশুর অসহায়ত্বই কি পিতামাতা ও সন্তানের মধ্যে গভীর স্নেহ-বন্ধনের ভিত্তি?

একটি শিশু জন্মের পর থেকেই অভিজ্ঞতা লাভ করে — তার কান্নার সাড়া মেলে, তার ক্ষুধার প্রতিক্রিয়া আসে, তার ভয় দূর করতে কেউ তাকে বুকে তুলে নেয়। এই পুনরাবৃত্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার মনে গড়ে ওঠে ‘অভিভাবক’-এর ধারণা। সে বিশ্বাস করতে শেখে — তার একজন প্রতিপালক আছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই প্রাথমিক নির্ভরতার অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতে এক বৃহত্তর বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে — একজন ‘বিশ্বপ্রতিপালক’-এ আস্থার

অন্যদিকে, নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে — মানুষের দীর্ঘ শৈশবই তার সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের প্রধান ভিত্তি। শিশুমস্তিষ্ক জন্মের পর দীর্ঘকাল নমনীয় থাকে; ফলে সে পরিবেশ থেকে ভাষা, মূল্যবোধ, শিল্প ও জ্ঞান সহজে আত্মস্থ করতে পারে। যদি মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মতো দ্রুত পরিণত হয়ে উঠত, তবে হয়তো জটিল সভ্যতা, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞান এভাবে বিকশিত হত না। মানুষের দুর্বলতাই তার শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে

অতএব, মানবশিশুর অসহায়ত্বকে কেবল সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একই সঙ্গে বিবর্তনের ফল, সামাজিকতার ভিত্তি এবং সম্ভবত আধ্যাত্মিক বোধেরও সূচনা। প্রকৃতি যেন মানুষকে সম্পর্কনির্ভর এক সত্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে — যেখানে বেঁচে থাকা মানেই পারস্পরিক নির্ভরতা

এই দৃষ্টিতে মানবশিশুর জন্মগত দুর্বলতা কোনও ত্রুটি নয়; বরং মানবজীবনের গভীর নকশা। সে অসম্পূর্ণ হয়ে আসে, যাতে পূর্ণতার পথে যাত্রা করতে পারে। তার সামনে খোলা থাকে বিকাশের বিস্তৃত প্রান্তর — যা কেবল কয়েক বছরের নয়, বরং সারাজীবনের। মানবসভ্যতার প্রতিটি নতুন প্রজন্ম সেই অসম্পূর্ণতাকে সঙ্গী করেই আবার শুরু করে, আবার গড়ে তোলে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের নতুন আকাশ 

অসীম দে
গুয়েল্ফ, অন্টারিও, কানাডা 

Popular posts from this blog

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ চেনার উপায়

সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ — সৃষ্টিতত্ত্বের মূলভাব

অমাবস্যা ও পূর্ণিমা : চন্দ্রসূর্যের মিলন ও বিরহ তিথি

তেলের সামাজিক মাহাত্ম্য

ঈশ্বর, প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

রাসলীলা : অন্তরলীলার মহিমা

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

সূর্য উপাসনা

হৃদয়-দর্পনে দেখা