বাউল ভাব : অন্তর্গত ঈশ্বরের আরাধনা
আমরা যখন সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে প্রার্থনা করি বা
অর্ঘ্য নিবেদন করি, অজান্তেই দৃষ্টি উঠে যায় আকাশের দিকে — যেন
আমাদের মাথার ওপরের সেই অনন্ত নীলেই তাঁর নিবাস। কিন্তু আকাশ তো সর্বত্র বিস্তৃত; পৃথিবী ঘুরছে, আর সেই সঙ্গে
আমাদের দৃষ্টির আকাশও প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনশীল আকাশের
মধ্যে তবে কোন দিকে স্থির করব তাঁর অবস্থান? কোথায় নিবেদন করব আমাদের ভক্তি, কোথায় পৌঁছাবে
আমাদের প্রার্থনা, আর কোথায়ই বা তাঁর প্রকৃত বাস?
এই প্রশ্নের উত্তরে একটি প্রাচীন কাহিনি শোনা
যায়। বলা হয়, সৃষ্টির আদিযুগে ঈশ্বর মানুষের রূপ ধারণ করে মানুষের মাঝেই বাস করতেন। মানুষের
ভক্তি, ভালবাসা ও
সান্নিধ্যে তিনি পরিতৃপ্ত হয়ে দিন কাটাতেন। কিন্তু ক্রমে এক জটিলতা দেখা দিল — মানুষের
অন্তহীন চাহিদা। একটি পূরণ হলেই আরেকটি এসে উপস্থিত; প্রার্থনার যেন শেষ নেই। যদিও সর্বশক্তিমান
ঈশ্বরের পক্ষে সব পূরণ করা অসম্ভব ছিল না, তবু সমস্যার মূল ছিল অন্যত্র।
![]() |
অন্তরতম |
“আপন ঘরে কে কথা কয়, না জেনে আসমানে
তাকায়...”
এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই তারা ঈশ্বরকে নাম দিল
‘মনের মানুষ’, ‘সহজ মানুষ’ — এক অন্তরঙ্গ, সহজপ্রাপ্য সত্তা।
বাউলদের বিশ্বাস, এই ‘মনের মানুষ’ কেবল বাউলের অন্তরেই সীমাবদ্ধ
নয়; জাত-পাত, ধর্ম, দেশ-কাল
নির্বিশেষে সকল মানুষের হৃদয়েই তাঁর অধিষ্ঠান। উপনিষদের বাণীও সেই সত্যকেই
প্রতিধ্বনিত করে — “সদা জনানাং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ”, অর্থাৎ সকল মানুষের হৃদয়ের মধ্যেই তাঁর আসন। এই
উপলব্ধিই বাউল ভাবাদর্শকে করে তোলে সর্বজনীন; এখানে বিভাজনের কোনও স্থান নেই, নেই কোনও দূরত্ব
— সবাই এক অন্তর্গত সত্যের অংশীদার।
বাউলের ঈশ্বর ‘সহজ মানুষ’ — কারণ তাঁকে লাভ করতে
কঠোর তপস্যা বা দুর্গম সাধনার প্রয়োজন হয় না। সুদূর আকাশ কিংবা গিরিকন্দরে নয়, তিনি অবস্থান
করেন মানুষের হৃদয়-মন্দিরে, একেবারে নিকটে। তাই তিনি সকলেরই ‘কাছের মানুষ’ —
মনের মানুষ। তাঁকে খুঁজে পাওয়ার পথও বহির্মুখী নয়, অন্তর্মুখী।
