Posts

নার্সিসাস : রূপান্তরিত ফুলের রূপকথা

Image
মানুষের দেহকোষে থাকে দুই ধরনের ক্রোমোসোম — স্ত্রী-ক্রোমোসোম এবং পুং-ক্রোমোসোম। একজন নারীর শরীরে থাকে কেবলমাত্র স্ত্রী-ক্রোমোসোম , ফলে তিনি জৈবিকভাবে সম্পূর্ণ নারী। অন্যদিকে একজন পুরুষের শরীরে একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে পুং ও স্ত্রী — যেন তিনি অর্ধনারীশ্বরের এক জীবন্ত রূপ ; তাঁর ভিতরেই অদৃশ্যভাবে বাস করে নরশক্তি ও নারীশক্তি। নর ও নারীর মধ্যে যেমন প্রেম জন্ম নেয় , তেমনি মানুষের নিজের মধ্যস্থিত দুই শক্তির মধ্যেও কখনও কখনও প্রেমে আবিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে — একে বলা যায় আত্মরতি বা আত্মপ্রেম। এই আত্মরতির এক মনোজাগতিক প্রতিমূর্তি আমরা দেখতে পাই গ্রিক পুরাণে । ইকো অ্যান্ড নার্সিসাস (খন্ডিত)/জন ওয়াটারহাউস গ্রিক পুরাণে বর্ণিত আছে নার্সিসাস নামের এক অতুল সুন্দর যুবকের কাহিনি। একদিন সে দিঘির স্বচ্ছ জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায় , এবং ধীরে ধীরে নিজের রূপেই প্রেমে পড়তে শুরু করে। সে প্রেম এতই প্রবল , এতই তীব্র , যে সে নিজের সঙ্গে রতিমিলনের আকাঙ্ক্ষায় উন্মত্ত হয়ে উঠে। কিন্তু মানবদেহ আত্মরতির জন্য নির্মিত নয় ; তাই তার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার আগুনে দগ্ধ হয়ে অবশেষে স...

পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে বাস্তবতা: কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও রবীন্দ্রনাথ

Image
আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই , চাঁদকে দেখতে পাই। কিন্তু যখন তাকাই না , তখনও কি চাঁদ সেখানে থাকে ? এই প্রশ্নটি তুলেছিলেন বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। কারণ , সে সময় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নতুন শাখায় ‘অবজারভার ইফেক্ট’ বা ‘ পর্যবেক্ষক প্রভাব ’ নামক একটি তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা চলছিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী , কোনও বস্তুর অবস্থা বা দশা নির্ধারিত হয় একজন সচেতন পর্যবেক্ষকের উপস্থিতির ভিত্তিতে। পর্যবেক্ষণ শুধু তথ্য সংগ্রহই করে না , বরং বাস্তবতার প্রকৃতিতেও প্রভাব ফেলে । এই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় রহস্য — দেখবার বস্তুটি নয় , যে দেখে সেই মানুষটি।’ সম্ভাবনা পর্যায়ের চাঁদ প্রশ্ন জাগে — যখন আমরা চাঁদের দিকে তাকাই না , তখনও কি চাঁদ সেখানে থাকে ? কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে , এই প্রশ্নের উত্তর হল: আমাদের দৃষ্টির আড়ালে যাওয়া মাত্রই চাঁদের অস্তিত্ব এক অনির্ধারিত সম্ভাবনার পর্যায়ে চলে যায়। কারণ , একজন সচেতন পর্যবেক্ষকের অনুপস্থিতিতে বস্তু প্রকৃত অর্থে নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকে না , বরং সম্ভাবনার একাধিক রূপে বিরাজ করে । এটি হয়তো অবিশ্বা...

আসব–যাব চিরদিনের সেই আমি

Image
১৯৪১ সালের ২২ শ্রাবণ। মৃত্যুশয্যায় শায়িত সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । জীবনের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত। চারদিকে নীরবতার আবহ , আর তার মধ্যেই ভেসে আসছে অবিরাম মন্ত্রোচ্চারণ — “ শান্তং শিবং অদ্বৈতম্” । কবি নিমীলিত নেত্রে ধ্যানমগ্ন । এমন সময় একজন শুভানুধ্যায়ী তাঁকে পরামর্শ দিলেন — “ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন , এ-জন্ম যেন আপনার শেষ জন্ম হয় ; আর যেন ফিরে আসতে না হয় এই দুঃখক্লিষ্ট পৃথিবীতে।” কবি চোখ খুললেন। কণ্ঠে যেন এক তীব্র আপত্তি — “ চুপ করুন।” তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বললেন — “ আমি তো তার উল্টো প্রার্থনাই করছি। হে ঈশ্বর , যে জীবন তুমি আমাকে দিয়েছ , তা এত সুন্দর যে এই দান তুমি আমাকে বারবার দাও। আমি আবার দেখতে চাই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত , তারাভরা রাতের বিস্ময় , ফুল , ডানামেলা পাখি , গাছ , নদী , পর্বত , মানুষ…। আমি ফিরে আসতে চাই বারবার , আরও বহুবার। এই পৃথিবী এত বিশাল , এত অফুরান প্রাচুর্যে পূর্ণ যে , আমার কাছে তা কোনও দিনও দীনহীন বা পুরাতন বলে মনে হয়নি।” এই কথায় যেন ধ্বনিত হয় কবির জীবনদর্শনের মূল সুর — পৃথিবীকে অস্বীকার নয় , তাকে গভীর আনন্দে গ্রহণ করা । আজ কব...

রবিরাগ অনুরাগ — প্রেক্ষিত সূর্যোদয় সূর্যাস্ত

Image
প্রতিদিন প্রভাতে সূর্য পূব আকাশে উদিত হয়ে যাত্রা শুরু করে। তারপর সারাদিন মাথার উপরের আকাশটা পরিভ্রমণ করে দিনশেষে পশ্চিম আকাশে অস্ত যায়। পরদিন আবার পূব আকাশে উদিত হয়। এতে এমন একটি ধারণার সৃষ্টি হয় যে, সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত ছিল ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত, যখন পূর্বতন প্রাশিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপারনিকাস বললেন, সূর্য পৃথিবীকে পরিক্রমণ করে না, বরং পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে পরিক্রমণ করে। তাই সূর্যের উদয় কিংবা অস্ত বলে কিছু থাকতে পারে না। সূর্যের উদয় কিংবা অস্ত মানুষের দৃষ্টিভ্রম মাত্র — প্রকৃত সত্য নয়, প্রতীয়মান সত্য মাত্র। এই বৈজ্ঞানিক তথ্যটি জানা সত্ত্বেও, আজও আমরা ‘সূর্যোদয়’ ও ‘সূর্যাস্ত’ শব্দ দু’টি নিঃসংকোচে ব্যবহার করে চলেছি। সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত সম্পর্কে একটি বিস্ময়কর কথা বলা হয়েছে ২৭০০ বছর আগে রচিত ছান্দোগ্য উপনিষদে — ‘সূর্য কখনও অস্ত যায় না, উদিতও হয় না। লোকে যখন মনে করে যে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, তখন তা কেবল দিনের শেষে পৌঁছে পথবদল করে, আর তখন তার নীচে হয় রাত্রি, আর অন্যদিকে দিন। তারপর যখন লোকে মনে করে যে সূর্য প্রাতে উঠছে, তখন তা কেবল রাত্রি...

মানুষ যখন হাসে

Image
পৃথিবীতে মানুষই সম্ভবত একমাত্র প্রাণী যে প্রকৃত অর্থে হাসতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন , মানুষ কথা বলতে শেখার বহু লক্ষ বছর আগেই হাসতে শিখেছিল। মানবসভ্যতার আদিম যুগে , ভাষা যখনও বিকশিত হয়নি , তখন আমাদের পূর্বপুরুষরা সম্ভবত হাসি ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেই মনের নানা অনুভূতি প্রকাশ করত। সেই অর্থে হাসি মানুষের অন্যতম প্রাচীন সামাজিক ভাষা । হাসি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মানবশিশু জন্মের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হাসতে শুরু করে। আশ্চর্যের বিষয় , যেসব শিশু জন্ম থেকেই অন্ধ ও বধির — যারা কখনও কাউকে হাসতে দেখেনি বা হাসির শব্দ শোনেনি — তারাও স্বাভাবিকভাবেই হাসতে পারে। অর্থাৎ হাসি শেখা-আচরণ নয় ; এটি মানুষের জৈব ও মানসিক গঠনের গভীরে প্রোথিত এক স্বাভাবিক ক্ষমতার প্রকাশ । সাধারণত মানুষ আনন্দ বা ভাল লাগার অনুভূতি প্রকাশ করে হাসির মাধ্যমে। এই হাসি স্বতঃস্ফূর্ত — অনায়াস ; সচেতন মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। তবে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবেও হাসতে পারে , যেমন কপট বা সামাজিক হাসি। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হল , উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের দেহে একধরনের ইতিবাচক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া ঘটে। কারণ হাসির সময় শরীরে এন্ডরফিন নামের বিশেষ হরমোন ...