Posts

যুক্তিহীনতা — মননে ও সৃজনে

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বিশ্বাস করতেন — ‘ মানুষ যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী । ’ তিনি যে অর্থেই কথাটা বলে থাকুন না কেন , প্রত্যেক মানুষ যে নিজেকে যুক্তিবাদী মনে করে তা বোধহয় ঠিক । নিজের সমস্ত আচরণই নিজের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয় । প্রকৃতপক্ষে , যুক্তি আলাদিনের চেরাগের মতো — যখন যার অধীন তার অভীষ্ট সিদ্ধ করে । মানুষ যখন যা করে তার পিছনে নিজস্ব যুক্তি থাকে । কোনও না কোনও যুক্তির সমর্থন ছাড়া মানুষ চলতে পারে না । একজন আস্তিক কিংবা নাস্তিক , একজন ধার্মিক কিংবা সন্ত্রাসী , একজন সাধু কিংবা ঠগ — প্রত্যেকেরই নিজের বিশ্বাস ও আচরণের পিছনে নিজস্ব যুক্তি থাকে । নিজস্ব যুক্তি থেকে আসে দ্বৈত - যৌক্তিকতা ; অর্থাৎ কোন আচরণটি যৌক্তিক তা ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন হয় । অনেক সময় , নিজের সুবিধার জন্য দুটি বিপরীত যুক্তিকেই গ্রহণ করা হয় । বলা বাহুল্য , এসব যুক্তি মানুষের তৈরি ; নিজেদের আচরণকে অন্তত নিজের কাছে যৌক্তিক করে তোলার উপায় মাত্র । প্রকৃতি মানুষের তৈরি যুক্তির ধার ধারে না । তাই প্রকৃতিকে বুঝতে হলে মানুষের তৈরি যুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে হয় । পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ মানু...

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

Image
কোথাও আলো জ্বালাতে গেলে দেখা যায় — অন্ধকার যেন আগেই সেখানে এসে বসে আছে। তবে কি অন্ধকারের গতি আলোর চেয়েও বেশি ? না , তা নয়। আসলে আলোর যেমন গতি আছে , অন্ধকারের তেমন গতি নেই। কারণ অন্ধকার সর্বত্র , চিরন্তন। মহাকাশের শূন্যস্থান , যেখানে চোখে কিছুই দেখা যায় না , সেটিও আসলে ভরতি ‘ডার্ক এনার্জি’তে। তাই আলো জ্বালাতে হয় — অন্ধকার নয়। অন্ধকার নিজেই সর্বব্যাপী , শাশ্বত। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী , অন্ধকার অজ্ঞতার প্রতীক। কিন্তু নিশাচর প্যাঁচা যদি বলে , " অন্ধকারই তো জ্ঞান ও দূরদর্শিতার চিহ্ন ," — তবে ? প্রকৃতপক্ষে , অন্ধকার একরৈখিক নয় ; এর বহু রূপ , বহু মানে। কখনও তা ভয় জাগায় , কখনও প্রশান্তি দেয় ; কখনও তা বিশ্রামের , কখনও প্রণয়ের পরিপূর্ণ আবহ তৈরি করে। অন্ধকার এককভাবে শুভ বা অশুভ নয় , বিজ্ঞ বা অবিজ্ঞ নয় — যে যেমন চোখে দেখে , তার কাছে অন্ধকার তেমনই হয়ে ওঠে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অন্ধকারকে দেখেছিলেন এক মোহিনী রূপসী হিসেবে। তিনি লিখেছিলেন — “ হঠাৎ চোখের উপরে যেন সৌন্দর্যের তরঙ্গ খেলিয়া গেল। মনে হইল , কোন মিথ্যাবাদী প্রচার করিয়াছে — আলোরই রূপ , আঁধারের রূপ নাই ? ... এই যে আকাশ-বাতাস স্ব...

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

Image
আধ্যাত্মিকতার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘স্পিরিচুয়ালিটি’। বর্তমান যুগে পাশ্চাত্য দুনিয়ায় এই শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। যেমন — স্পিরিচুয়ালিটি অফ ওয়ার্ক , স্পিরিচুয়ালিটি অফ লাভ , স্পিরিচুয়ালিটি অফ ডেথ , স্পিরিচুয়ালিটি অফ ন্যাচার ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে — কী এই ‘স্পিরিচুয়ালিটি’ ? ‘ স্পিরিচুয়ালিটি’ শব্দটির অর্থ যুগে যুগে বিবর্তিত হয়েছে। এক সময় স্পিরিচুয়ালিটি বলতে বোঝানো হতো কেবলই ‘ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক’ ; কিন্তু আধুনিক কালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘অন্তরাত্মার সঙ্গে সম্পর্ক’ । ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত সপ্তদশ শতাব্দীর ফ্রান্সে এক নতুন আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটে , যা বিশেষভাবে অন্তরের গভীর অনুভূতিকে স্পিরিচুয়ালিটির সঙ্গে যুক্ত করে। তখন বলা হয় , ধর্ম ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার বিষয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গির্জার অনুশাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। তবে এটি অসাম্প্রদায়িক ছিল এবং নব্য-উদারপন্থী রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ । পরবর্তী সময়ে , আধ্যাত্মিক চেতনা আরও বিকশিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ‘নিউ এইজ স্পিরিচুয়ালিটি’ নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই আন্দোলন...

অগ্রহায়ণ — নববর্ষ থেকে নবান্ন

Image
‘ ও মা , অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি , আমার সোনার বাংলা । ’ রবীন্দ্রনাথ যে সোনার বাংলার কথা বলেছেন তা মূলত অঘ্রানের বাংলা । কারণ অঘ্রান মাসে বাংলার উর্বর জমিতে সোনা ফলে । বাংলার মাঠ ছেয়ে যায় সোনালি ধানে । পরনে সোনালি পরিধান , মুখে মধুর হাসি — মায়ের এই অপরূপ রূপ দেখে বাঙালির আনন্দের সীমা থাকে না । অগ্রহায়ণ বাঙালির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস ।   মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (১৫৪০-১৬০০) বলেছেন  — ‘ ধন্য অগ্রহায়ণ মাস ,  ধন্য অগ্রহায়ণ মাস ।   বিফল জনম তার ,  নাই যার চাষ । ’   এই মাসে কৃষক ঘরে তুলে বছরের প্রধান শস্য আমন ধান ।   ঘরে ঘরে ধুম পড়ে আনন্দ উৎসবের ।   নতুন ধানের নতুন চালে তৈরি হয় নবান্ন ,  মিষ্টান্ন ।   বাংলার কৃষক মেতে উঠে উৎসবের আনন্দে । একদিন অগ্রহায়ণ ছিল বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস । নামেও তা স্পষ্ট । ‘ অগ্র ’ মানে প্রথম , ‘ হায়ন ’ মানে বছর । অর্থাৎ ‘ হায়ন ’ বা বছরের প্রারম্ভে থাকে যে মাস তার নাম অগ্রহায়ণ । অতীতে আমাদের নববর্ষের দিন ছিল পহেলা অগ্রহায়ণ । বৈশাখ কবে থেকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণ্য হল...

কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা

হেমন্ত — হেম বরণ অর্থাৎ সোনালি রঙের ঋতু ; পাকা ধানের রঙে ধন্য । হেমন্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ঋতুও বটে । আমরা বসন্ত ও গ্রীষ্মে যা বপন করি , হেমন্তে তার ফসল ঘরে তুলি । সেজন্য ধরিত্রী মাতাকে কৃতজ্ঞতা জানাই — নবান্ন করি , থ্যাঙ্কসগিভিং করি । তাই কৃতজ্ঞতার রং সোনালি । বলা হয়ে থাকে , কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষের হৃদয়কে সমৃদ্ধ করে । শুধু তা - ই নয় , কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষের সুস্থ জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে বলেও মনে করেন বিজ্ঞানীরা । সম্প্রতি , ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া ( বার্কলে ) ও ইউসি ( ডেভিস )- এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে , যারা প্রতিনিয়ত কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা করেন , তারা অনেক রকমের উপকার পেয়ে থাকেন । যেমন :  শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেমস এবং নিম্ন রক্তচাপ  উচ্চ স্তরের ইতিবাচক আবেগ  অধিক আনন্দ , আশাবাদ , ও সুখবোধ  অধিক ঔদার্য ও সমবেদনা  অপেক্ষাকৃত কম একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যেক মানুষের জীবনে সাফল্য ও ভাল থাকার পিছনে থাকে অন্য কিছু মানুষের অবদান । সর্বোপরি থাকেন জগদীশ্বর । তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা যেতে পারে । প্রকৃতির রূপ , রস , সৌন্দর্য...