Posts

গরু প্রোটিন কোথা থেকে পায়?

Image
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী , গরু তৃণভোজী প্রাণী — অর্থাৎ , এটি ঘাস-খড় খেয়ে জীবনধারণ করে। নিরামিষভোজীদের অনেকে মনে করেন , যদি গরু শুধুমাত্র উদ্ভিদজাত খাবার খেয়ে দুধ ও মাংস উৎপাদন করতে পারে , তাহলে মানুষও কেন শুধুমাত্র উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ করে শক্তিশালী শরীর গঠন করতে পারবে না ? তাঁদের মতে , মানুষ প্রকৃতপক্ষে নিরামিষভোজী প্রাণী । কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে — একটি ৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের গরু পর্যাপ্ত প্রোটিন কোথা থেকে পায় ? শুধুমাত্র ঘাস ও খড় থেকেই কি গরুর প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হয় ? প্রোটিন গঠনের জন্য শরীরকে বাইশটি অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রয়োজন হয় , যার মধ্যে নয়টি শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। এগুলোকে বলা হয় ‘অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড’ , যা আমাদের খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। প্রাণিজ প্রোটিনে এসব অ্যামিনো অ্যাসিড সম্পূর্ণভাবে উপস্থিত থাকলেও , উদ্ভিদজাত প্রোটিনে তা অসম্পূর্ণ থাকে। তাই শুধু উদ্ভিদজাত খাবার থেকে প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করা বেশ ‘চ্যালেঞ্জিং’ । গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ঘাস ও খড়ে তেমন প্রোটিন বা উচ্চমানের পুষ্টিগুণ থাকে না। এগুলোর প্রধান উপাদান হল সেলুলোজ , যা এক ধরনের কার্বোহাইড্...

স্বপ্ন, বাস্তবতা ও অবচেতন মন

Image
মানুষের মন প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত — সচেতন মন এবং অবচেতন মন। সচেতন মন আমাদের জাগ্রত অবস্থায় পরিচালিত করে , যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব নেয়। অন্যদিকে , অবচেতন মন কাজ করে অন্তরালে , আমাদের অনুভূতি , স্মৃতি ও স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুমের সময় যখন সচেতন মন নিষ্ক্রিয় হয় , তখন অবচেতন মন সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং আমাদের মানসিক প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে , মানুষের মানসিক শক্তির মাত্র ৫-১০ শতাংশ সচেতন মনের অধীন , আর বাকি ৯০-৯৫ শতাংশ অবচেতন মন দ্বারা পরিচালিত । স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করেন , আমাদের মস্তিষ্কই বাস্তবতা গঠন করে। যেহেতু মনের প্রকৃতি দ্বিবিধ , তাই বাস্তবতাও দুই রকম — সচেতন মনের বাস্তবতা এবং অবচেতন মনের বাস্তবতা। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা যে জগৎ প্রত্যক্ষ করি , সেটাই সচেতন মনের বাস্তবতা। একে আমরা প্রকৃত বাস্তবতা বলে ধরে নিই। কিন্তু ঘুমের মধ্যে অবচেতন মন যে অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে , তাকেও এক ধরনের বাস্তবতা বলা যায় , যা স্বপ্নবাস্তবতা নামে পরিচিত। শিল্প , সাহিত্য ও মনস্তত্ত্বে একে পরাবাস্তব ( surreal) বলা হয় , কারণ এটি যুক্তির সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে গিয়ে গভীর অন্...

জিশু খ্রিস্টের আত্মবলিদান

Image
‘ গুড ফ্রাইডে’ বা ‘পবিত্র শুক্রবার’ হল সেই দিন , যখন জিশু খ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ৩৩ খ্রিস্টাব্দে , সম্ভবত ৩ এপ্রিল , শুক্রবার এই ঘটনা ঘটে । এর আগের দিন , বৃহস্পতিবার ছিল ইহুদিদের বার্ষিক ‘পাসওভার’ বা ‘নিস্তার-পার্বণ’ , যা পাপ থেকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে পালিত হত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী , আদমের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে নিস্পাপ প্রাণের বলি দেওয়া আবশ্যক ছিল । এই উপলক্ষে , জিশু তাঁর বারোজন শিষ্যের সঙ্গে এক শেষ নৈশভোজে মিলিত হন , যা আজ ‘ দ্য লাস্ট সাপার’ নামে পরিচিত। সেখানে রুটি ও মদ ভোজনের অংশ ছিল। তিনি শিষ্যদের রুটি দিয়ে বললেন , ‘ এটি আমার দেহ , তোমরা গ্রহণ করো। ’ এরপর মদের পেয়ালা দিয়ে বললেন , ‘ এটি আমার রক্ত , যা তোমাদের জন্য প্রবাহিত হবে। ’ এর মাধ্যমে তিনি তাঁর আসন্ন আত্মবলিদানের প্রতীকী ব্যাখ্যা দেন । প্রাচীন ইজরায়েলে ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য নরবলি প্রচলিত ছিল , এমনকী নিজ সন্তান বলি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অব্রাহাম যখন ঈশ্বরের আদেশে তাঁর পুত্র ইসহাককে বলি দিতে প্রস্তুত হন , তখন ঈশ্বর নরবলির পরিবর্তে পশুবলির নির্দেশ দেন। পরে পাপমোচনের জন্য পশুবলি প্রথা প্রচলিত হয় , য...

অকারণ সুখ : অন্তরের পরিপূর্ণতা

Image
সুখ — মনের এমন এক অবস্থা , যা সবাই কামনা করে। সুস্থতা , স্বাচ্ছন্দ্য , আনন্দ , ভালবাসা ও তৃপ্তির মতো ইতিবাচক অনুভূতিগুলোর সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ নানাভাবে সুখ অনুভব করতে পারে — লক্ষ্য অর্জন , ইচ্ছাপূরণ , সুসংবাদ পাওয়া কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো ইত্যাদি তার কিছু সাধারণ মাধ্যম। তবে , কিছু সময় কোনও বাহ্যিক কারণ ছাড়াই মানুষ সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করে , যা অকারণ-সুখ নামে পরিচিত । সাধারণভাবে , মানুষ মনে করে — ' আমি সুখী হব , যদি যা চাই তা পাই এবং যা চাই না তা এড়িয়ে চলতে পারি। ’ এ ধরনের সুখ নির্ভরশীল ও শর্তযুক্ত , যা আসলে এক মরীচিকা। কারণ , আকাঙ্ক্ষার কোনও শেষ নেই ; একটির পর আরেকটি চাওয়া সামনে এসে দাঁড়ায় , ফলে সুখ অধরা থেকে যায়। পক্ষান্তরে , অকারণ-সুখ নিঃশর্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত , যা মানুষের অন্তর্নিহিত স্বাভাবিক অবস্থা । আমাদের দৈনন্দিন সামাজিক বিনিময়ে আমরা জিজ্ঞেস করি — ‘ কেমন আছেন ? ’ যদি কেউ উত্তর দেয় , ‘ ভাল আছি ’ , সাধারণত আমরা আর জানতে চাই না — কেন ভাল আছেন ? সুখ ও সুস্থতা আমাদের স্বাভাবিক অবস্থা বলেই এ প্রশ্ন অবান্তর মনে হয়। কিন্তু কেউ যদি বলে , ‘ ভাল নেই ’ , তখন তার ...

ময়ূরের সৌন্দর্য ও বিবর্তনের রহস্য

Image
জীবজগতে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন প্রাণীদের মধ্যে ময়ূর অন্যতম। ময়ূর যখন তার বিচিত্রবর্ণের পাখা মেলে ধরে , তখন তা এক অপার বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ময়ূরের সৌন্দর্যের মূল রহস্য তার জমকালো বহুবর্ণা লেজ বা পুচ্ছ। তবে এই পুচ্ছ তার দেহের তুলনায় অত্যন্ত ভারী , যা সম্ভবত তাকে উড়তে বাধা দেয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় টুনটুনি পাখি ময়ূরের ভারী লেজ নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছিল: ‘ রে ময়ূর , তোকে দেখে করুণায় মোর জল আসে চোখে। … আমি দেখো লঘুভারে ফিরি দিনরাত , তোমার পশ্চাতে পুচ্ছ বিষম উৎপাত । ’ তবে ময়ূর পাল্টা যুক্তি দেয় যে , ভার থাকলেই তা উৎপাত হয় না , বরং গৌরবের প্রতীকও হতে পারে । ডারউইনের দৃষ্টিভঙ্গি ও যৌন নির্বাচন তত্ত্ব বিবর্তন তত্ত্বের প্রবক্তা চার্লস ডারউইন ময়ূরের পুচ্ছ সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। তিনি ময়ূরপুচ্ছ এতটাই অপছন্দ করতেন যে , এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন , ‘ যখনই ময়ূরপুচ্ছের পালকের দিকে তাকাই , আমার বমি-বমি ভাব হয়। ’ তার বিবর্তন তত্ত্ব অনুসারে , প্রাণীর প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের উপযোগিতা থাকা উচিত। কিন্তু ময়ূরের পুচ্ছ দেখে তিনি বিভ্রান্ত হন , কারণ এটি কোনওভাবেই টিকে থাকার লড়াইয়ে সুবিধা দেয় না , বর...

বাক্-দেবী সরস্বতী: শব্দের অন্তরালে এক দীপ্ত প্রতিমা

Image
মানুষ কথা বলে — এ তো আমাদের জানা। কিন্তু এই ‘কথা বলা’ই তাকে অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা করে দেয়। পশু-পাখিরাও ধ্বনি সৃষ্টি করে , যোগাযোগের চেষ্টা করে বটে , তবে তা ভাষা নয়। তারা ‘ধ্বনি’ করে , কিন্তু তা দিয়ে গড়ে তুলতে পারে না অর্থবোধক শব্দ বা বাক্য। মানুষের মতো স্পষ্ট উচ্চারণ , চিন্তনক্ষমতা ও জটিল ভাব প্রকাশ তাদের আয়ত্তে নেই । কথা বলার ক্ষমতা মানুষের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই ক্ষমতার উৎস এক জটিল শারীরবৃত্তীয় কাঠামো — বাক্-যন্ত্র। এটি কোনও একক অঙ্গ নয় , বরং বহু অঙ্গের সম্মিলিত কর্মযজ্ঞ। ফুসফুসের বাতাস , কণ্ঠনালির স্বর , মুখগহ্বরের প্রতিসরণ , জিহ্বার গতি , ঠোঁটের নাচন , দাঁত ও নাসারন্ধ্রের সহযোগিতায় যে শব্দ উৎপন্ন হয় , তা-ই রূপ নেয় বাক্যে , ভাষায়। শব্দ যেন মানুষের শরীরের ভেতরে এক নিখুঁত সুরলিপির মতো জন্ম নেয় , আর উচ্চারণে মূর্ত হয় । তবে প্রশ্ন থেকে যায় — এই বিস্ময়কর ক্ষমতা কি নিছক প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফসল ? অনেক বিবর্তনবাদী বলবেন , হ্যাঁ — এটি দীর্ঘকালীন বিবর্তনেরই ফল। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন , এত সূক্ষ্ম এবং অর্থবহ এক ব্যবস্থার পেছনে কেবল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নয় , থাকতে পারে কোনও ...