Posts

মহাবিশ্বে মহাকাব্যে

মহাবিশ্বের ইংরেজি শব্দ Universe অত্যন্ত সুন্দর এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। শব্দটি তৈরি হয়েছে Uni ( এক) এবং Verse ( ছন্দোবদ্ধ রচনা) এই দুটি শব্দের মিলনের ফলে । সুতরাং , Universe- এর প্রকৃত অর্থ এক অনন্ত কবিতা — এক মহাকাব্য , এক মহাসংগীত , যার প্রতিটি নক্ষত্র , গ্রহ , নদী , বৃক্ষ , প্রাণ এবং মানুষ সেই সৃষ্টির অমর পঙ্‌ক্তিমালার অংশ । এই দৃষ্টিতে মহাবিশ্ব কেবল জড় পদার্থের সমষ্টি নয় ; এটি এক সৃজনশীল প্রকাশ। আকাশগঙ্গার ঘূর্ণন , নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যু , ঋতুর আবর্তন , ফুলের প্রস্ফুটন , পাখির গান , মানুষের হাসি-কান্না — সবকিছু মিলিয়ে যেন এক বিশাল সিম্ফনি , এক অনন্ত কাব্যধারা। আর যিনি এই মহাকাব্যের স্রষ্টা তিনি মহাকবি — যাঁর কল্পনা ও সৃজনশক্তির বিস্তার অসীম । এই অনুভব থেকে সেই মহাকবির উদ্দেশে বলা যায় — ‘ মহাবিশ্বে মহাকাব্যে তুমি আছ অসীম রহস্যে । ’ মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা , প্রতিটি ঘটনা , প্রতিটি প্রাণের অন্তরালে যেন লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় উপস্থিতি। বিজ্ঞান সেই রহস্যের সূত্র খোঁজে , দর্শন তার অর্থ অনুসন্ধান করে , আর কবিতা তার সৌন্দর্য অনুভব করে । আমরা প্রত্যেকেই এই মহাকাব্যের একটি পঙ্‌ক্...

সনাতন ধর্ম: চিরন্তন সত্য ও হিন্দুর জীবনদর্শন

‘ সনাতন ধর্ম’ — এক গভীরতর ভাবধারার নাম , যা হিন্দুধর্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হলেও তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত , অনেক ব্যাপক। হিন্দুরা তাঁদের ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যকে ‘সনাতন ধর্ম’ বলেই চিহ্নিত করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল , ‘ সনাতন’ শব্দটির তাৎপর্য কী ? কেনই বা এই ধর্মকে ‘সনাতন’ বলা হয় ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন । শব্দতত্ত্ব: ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’ শব্দের অন্তর্নিহিত ব্যাকরণ ‘ সনাতন ’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘সন’ ধাতু থেকে , যার অর্থ — চিরন্তন , অনাদি , অবিনাশী। অর্থাৎ , যা কালের সীমায় আবদ্ধ নয় , যা সর্বকালেই সত্য , তা-ই সনাতন । ‘ ধর্ম ’ শব্দের উৎস ‘ধৃ’ ধাতু — যার অর্থ ধারণ করা। যে তত্ত্ব ব্যক্তি , সমাজ ও বিশ্বকে ধরে রাখে , সংহত রাখে , শৃঙ্খলাবদ্ধ করে — তা-ই ধর্ম । এই অর্থে , ‘ সনাতন ধর্ম’ হল সেই অনাদি নৈতিক শক্তি , যা ব্যক্তি ও সমাজকে চিরকাল ধরে ধারণ করে চলেছে । সনাতন ধর্মের দুই প্রাসঙ্গিক অর্থ সনাতন ধর্ম মূলত দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়: ১) প্রচলিত ও প্রাচীন ধর্ম অর্থে: যদিও সনাতন ধর্মের উৎপত্তি অতি প্রাচীন , ‘ সনাতন ধর্ম’ শব্দটি ব্যবহারিক গুরুত্ব পায় ইসলামি যুগের পর। ১২০৬ খ্রি...

হিন্দুত্ব বনাম হিন্দুইজম: ধর্ম নাকি জীবনদর্শন?

হিন্দু কি একটি মতবাদ ? হিন্দু শব্দের প্রকৃত ব্যাখ্যা কী ? হিন্দু ও হিন্দুইজম কি সমার্থক ? সম্প্রতি , এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করা হয়েছে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড হিন্দু কংগ্রেস’-এর বার্ষিক সম্মেলনে। ২৪-২৬ নভেম্বর , ২০২৩-এ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত সেই সম্মেলনে ৬১টি দেশ থেকে ২ , ০০০-এরও বেশি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব , সংগঠন ও প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন । এই বিশ্ব হিন্দু সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা গৃহীত হয় , যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘হিন্দুইজম’ ( Hinduism) শব্দকে বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং এর পরিবর্তে ‘হিন্দুত্ব’ ( Hindutva) ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়। এখন থেকে , ‘ হিন্দুত্ব’ হবে বিশ্বের ১০০টি দেশে বসবাসরত ১২০ কোটির বেশি মানুষের জীবনদর্শনের প্রতীক , যা সকলের সংস্থান ও সহাবস্থানকে সুনিশ্চিত করে । হিন্দুত্ব: জীবনদর্শন নাকি মতবাদ ? ‘ হিন্দুত্ব’ নতুন কোনও ধারণা নয়। যখন থেকে হিন্দু জাতির উৎপত্তি , তখন থেকেই ‘হিন্দুত্ব’ বিদ্যমান। এটি হিন্দুদের বৈশিষ্ট্যগত ভাব , যেমন মানুষের মনুষ্যত্ব , দেবতার দেবত্ব। এটি ‘হিন্দুনেস’ ( Hinduness) নামে পরিচিত হতে পারে , তবে ‘হিন্দুইজম’ কখনওই নয় । ‘ হিন...

বাটারফ্লাই ইফেক্ট: সামান্য পরিবর্তনের বিশাল প্রভাব

Image
দিল্লিতে যদি একটি প্রজাপতি ডানা ঝাপটায় , তবে সেই ডানা ঝাপটানোর কারণে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হতে পারে কি ? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা যা জানি , তা ঠিক না-ও হতে পারে । বিশিষ্ট মার্কিন গণিতবিদ এবং আবহাওয়াবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ মনে করেন , প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর কারণে ঘূর্ণিঝড় হতেও পারে । লরেঞ্জের উক্তি — ‘When a butterfly flutters its wings in one part of the world, it can eventually cause a hurricane in another’ । এই অদ্ভুত বক্তব্যের সমর্থনে তিনি যে তত্ত্ব দাঁড় করেছেন তার নাম দিয়েছেন ‘ বাটারফ্লাই ইফেক্ট ’ । এই তত্ত্ব অনুসারে একটি বিশৃঙ্খল এবং জটিল সিস্টেমের একপ্রান্তে ঘটিত অতি ক্ষুদ্র কোনও পরিবর্তন বা ঘটনা  (যেমন , প্রজাপতির পাখা ঝাপটানো) অন্যপ্রান্তে বৃহত্তর এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফল তৈরি করতে পারে , যেমন একটি ঘূর্ণিঝড় । বাটারফ্লাই ইফেক্ট এডওয়ার্ড লরেঞ্জ গবেষণা করেছেন আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে । তিনি দেখিয়েছেন যে , একটি প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর মতো ক্ষুদ্র ঘটনা অন্যত্র আবহাওয়ার বিরাট পরিবর্তনের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে । তাছাড়া , গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে লরেঞ্জ যে গ্রাফ পেয়েছেন তা দে...

ওপেনহাইমার: এক বিস্ময়কর প্রতিভার দ্বন্দ্ব

Image
রবার্ট ওপেনহাইমার ছিলেন এক অসামান্য প্রতিভাধর বিজ্ঞানী। তাঁর অবদান কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং ফলিত পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ হলেও , তিনি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন পরমাণু বোমা তৈরির নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি আমেরিকার ম্যানহাটন প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বেই তৈরি পরমাণু বোমা ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত হয় । জ্ঞানসাধনা ও বহুমুখী কৌতূহল ওপেনহাইমার ছিলেন বহুমুখী জ্ঞানের অধিকারী। বিজ্ঞানের পাশাপাশি দর্শন , সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতায়ও ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। কার্ল মার্কস , সিগমন্ড ফ্রয়েড , ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা — এসব বিষয়েও তাঁর গভীর অধ্যয়ন ছিল। তিনি সংস্কৃত ভাষা শিখে মূল ভাষায় ভগবদগীতা পড়েছিলেন। তাঁর জীবনদর্শনের গঠনে ভগবদগীতা ও শার্ল বোদলেয়ারের ‘দ্য ফ্লাওয়ারস অফ ইভিল’ বই দুটি বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল । বিজ্ঞানী , কবি ও দার্শনিক ওপেনহাইমার সম্পর্কে বলা হয় , তিনি ছিলেন একজন ‘ scientist who writes like a poet, and speaks like a prophet’ । সূক্ষ্ম সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি বোদলেয়ারের কবিতা ফরাসি ভাষায় এবং ভগবদগীত...