Posts

Showing posts with the label ঐতিহ্য

সনাতন ধর্ম: চিরন্তন সত্য ও হিন্দুর জীবনদর্শন

‘ সনাতন ধর্ম’ — এক গভীরতর ভাবধারার নাম , যা হিন্দুধর্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হলেও তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত , অনেক ব্যাপক। হিন্দুরা তাঁদের ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যকে ‘সনাতন ধর্ম’ বলেই চিহ্নিত করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল , ‘ সনাতন’ শব্দটির তাৎপর্য কী ? কেনই বা এই ধর্মকে ‘সনাতন’ বলা হয় ? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন । শব্দতত্ত্ব: ‘সনাতন’ ও ‘ধর্ম’ শব্দের অন্তর্নিহিত ব্যাকরণ ‘ সনাতন ’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘সন’ ধাতু থেকে , যার অর্থ — চিরন্তন , অনাদি , অবিনাশী। অর্থাৎ , যা কালের সীমায় আবদ্ধ নয় , যা সর্বকালেই সত্য , তা-ই সনাতন । ‘ ধর্ম ’ শব্দের উৎস ‘ধৃ’ ধাতু — যার অর্থ ধারণ করা। যে তত্ত্ব ব্যক্তি , সমাজ ও বিশ্বকে ধরে রাখে , সংহত রাখে , শৃঙ্খলাবদ্ধ করে — তা-ই ধর্ম । এই অর্থে , ‘ সনাতন ধর্ম’ হল সেই অনাদি নৈতিক শক্তি , যা ব্যক্তি ও সমাজকে চিরকাল ধরে ধারণ করে চলেছে । সনাতন ধর্মের দুই প্রাসঙ্গিক অর্থ সনাতন ধর্ম মূলত দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়: ১) প্রচলিত ও প্রাচীন ধর্ম অর্থে: যদিও সনাতন ধর্মের উৎপত্তি অতি প্রাচীন , ‘ সনাতন ধর্ম’ শব্দটি ব্যবহারিক গুরুত্ব পায় ইসলামি যুগের পর। ১২০৬ খ্রি...

হিন্দুত্ব বনাম হিন্দুইজম: ধর্ম নাকি জীবনদর্শন?

হিন্দু কি একটি মতবাদ ? হিন্দু শব্দের প্রকৃত ব্যাখ্যা কী ? হিন্দু ও হিন্দুইজম কি সমার্থক ? সম্প্রতি , এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করা হয়েছে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড হিন্দু কংগ্রেস’-এর বার্ষিক সম্মেলনে। ২৪-২৬ নভেম্বর , ২০২৩-এ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত সেই সম্মেলনে ৬১টি দেশ থেকে ২ , ০০০-এরও বেশি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব , সংগঠন ও প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন । এই বিশ্ব হিন্দু সম্মেলনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা গৃহীত হয় , যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘হিন্দুইজম’ ( Hinduism) শব্দকে বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং এর পরিবর্তে ‘হিন্দুত্ব’ ( Hindutva) ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়। এখন থেকে , ‘ হিন্দুত্ব’ হবে বিশ্বের ১০০টি দেশে বসবাসরত ১২০ কোটির বেশি মানুষের জীবনদর্শনের প্রতীক , যা সকলের সংস্থান ও সহাবস্থানকে সুনিশ্চিত করে । হিন্দুত্ব: জীবনদর্শন নাকি মতবাদ ? ‘ হিন্দুত্ব’ নতুন কোনও ধারণা নয়। যখন থেকে হিন্দু জাতির উৎপত্তি , তখন থেকেই ‘হিন্দুত্ব’ বিদ্যমান। এটি হিন্দুদের বৈশিষ্ট্যগত ভাব , যেমন মানুষের মনুষ্যত্ব , দেবতার দেবত্ব। এটি ‘হিন্দুনেস’ ( Hinduness) নামে পরিচিত হতে পারে , তবে ‘হিন্দুইজম’ কখনওই নয় । ‘ হিন...

জিশু খ্রিস্টের আত্মবলিদান

Image
‘ গুড ফ্রাইডে’ বা ‘পবিত্র শুক্রবার’ হল সেই দিন , যখন জিশু খ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ৩৩ খ্রিস্টাব্দে , সম্ভবত ৩ এপ্রিল , শুক্রবার এই ঘটনা ঘটে । এর আগের দিন , বৃহস্পতিবার ছিল ইহুদিদের বার্ষিক ‘পাসওভার’ বা ‘নিস্তার-পার্বণ’ , যা পাপ থেকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে পালিত হত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী , আদমের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে নিস্পাপ প্রাণের বলি দেওয়া আবশ্যক ছিল । এই উপলক্ষে , জিশু তাঁর বারোজন শিষ্যের সঙ্গে এক শেষ নৈশভোজে মিলিত হন , যা আজ ‘ দ্য লাস্ট সাপার’ নামে পরিচিত। সেখানে রুটি ও মদ ভোজনের অংশ ছিল। তিনি শিষ্যদের রুটি দিয়ে বললেন , ‘ এটি আমার দেহ , তোমরা গ্রহণ করো। ’ এরপর মদের পেয়ালা দিয়ে বললেন , ‘ এটি আমার রক্ত , যা তোমাদের জন্য প্রবাহিত হবে। ’ এর মাধ্যমে তিনি তাঁর আসন্ন আত্মবলিদানের প্রতীকী ব্যাখ্যা দেন । প্রাচীন ইজরায়েলে ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য নরবলি প্রচলিত ছিল , এমনকী নিজ সন্তান বলি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অব্রাহাম যখন ঈশ্বরের আদেশে তাঁর পুত্র ইসহাককে বলি দিতে প্রস্তুত হন , তখন ঈশ্বর নরবলির পরিবর্তে পশুবলির নির্দেশ দেন। পরে পাপমোচনের জন্য পশুবলি প্রথা প্রচলিত হয় , য...

বাক্-দেবী সরস্বতী: শব্দের অন্তরালে এক দীপ্ত প্রতিমা

Image
মানুষ কথা বলে — এ তো আমাদের জানা। কিন্তু এই ‘কথা বলা’ই তাকে অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা করে দেয়। পশু-পাখিরাও ধ্বনি সৃষ্টি করে , যোগাযোগের চেষ্টা করে বটে , তবে তা ভাষা নয়। তারা ‘ধ্বনি’ করে , কিন্তু তা দিয়ে গড়ে তুলতে পারে না অর্থবোধক শব্দ বা বাক্য। মানুষের মতো স্পষ্ট উচ্চারণ , চিন্তনক্ষমতা ও জটিল ভাব প্রকাশ তাদের আয়ত্তে নেই । কথা বলার ক্ষমতা মানুষের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই ক্ষমতার উৎস এক জটিল শারীরবৃত্তীয় কাঠামো — বাক্-যন্ত্র। এটি কোনও একক অঙ্গ নয় , বরং বহু অঙ্গের সম্মিলিত কর্মযজ্ঞ। ফুসফুসের বাতাস , কণ্ঠনালির স্বর , মুখগহ্বরের প্রতিসরণ , জিহ্বার গতি , ঠোঁটের নাচন , দাঁত ও নাসারন্ধ্রের সহযোগিতায় যে শব্দ উৎপন্ন হয় , তা-ই রূপ নেয় বাক্যে , ভাষায়। শব্দ যেন মানুষের শরীরের ভেতরে এক নিখুঁত সুরলিপির মতো জন্ম নেয় , আর উচ্চারণে মূর্ত হয় । তবে প্রশ্ন থেকে যায় — এই বিস্ময়কর ক্ষমতা কি নিছক প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফসল ? অনেক বিবর্তনবাদী বলবেন , হ্যাঁ — এটি দীর্ঘকালীন বিবর্তনেরই ফল। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন , এত সূক্ষ্ম এবং অর্থবহ এক ব্যবস্থার পেছনে কেবল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নয় , থাকতে পারে কোনও ...