Posts

ময়ূরের সৌন্দর্য ও বিবর্তনের রহস্য

Image
জীবজগতে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন প্রাণীদের মধ্যে ময়ূর অন্যতম। ময়ূর যখন তার বিচিত্রবর্ণের পাখা মেলে ধরে , তখন তা এক অপার বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ময়ূরের সৌন্দর্যের মূল রহস্য তার জমকালো বহুবর্ণা লেজ বা পুচ্ছ। তবে এই পুচ্ছ তার দেহের তুলনায় অত্যন্ত ভারী , যা সম্ভবত তাকে উড়তে বাধা দেয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় টুনটুনি পাখি ময়ূরের ভারী লেজ নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছিল: ‘ রে ময়ূর , তোকে দেখে করুণায় মোর জল আসে চোখে। … আমি দেখো লঘুভারে ফিরি দিনরাত , তোমার পশ্চাতে পুচ্ছ বিষম উৎপাত । ’ তবে ময়ূর পাল্টা যুক্তি দেয় যে , ভার থাকলেই তা উৎপাত হয় না , বরং গৌরবের প্রতীকও হতে পারে । ডারউইনের দৃষ্টিভঙ্গি ও যৌন নির্বাচন তত্ত্ব বিবর্তন তত্ত্বের প্রবক্তা চার্লস ডারউইন ময়ূরের পুচ্ছ সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। তিনি ময়ূরপুচ্ছ এতটাই অপছন্দ করতেন যে , এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন , ‘ যখনই ময়ূরপুচ্ছের পালকের দিকে তাকাই , আমার বমি-বমি ভাব হয়। ’ তার বিবর্তন তত্ত্ব অনুসারে , প্রাণীর প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের উপযোগিতা থাকা উচিত। কিন্তু ময়ূরের পুচ্ছ দেখে তিনি বিভ্রান্ত হন , কারণ এটি কোনওভাবেই টিকে থাকার লড়াইয়ে সুবিধা দেয় না , বর...

বাক্-দেবী সরস্বতী: শব্দের অন্তরালে এক দীপ্ত প্রতিমা

Image
মানুষ কথা বলে — এ তো আমাদের জানা। কিন্তু এই ‘কথা বলা’ই তাকে অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা করে দেয়। পশু-পাখিরাও ধ্বনি সৃষ্টি করে , যোগাযোগের চেষ্টা করে বটে , তবে তা ভাষা নয়। তারা ‘ধ্বনি’ করে , কিন্তু তা দিয়ে গড়ে তুলতে পারে না অর্থবোধক শব্দ বা বাক্য। মানুষের মতো স্পষ্ট উচ্চারণ , চিন্তনক্ষমতা ও জটিল ভাব প্রকাশ তাদের আয়ত্তে নেই । কথা বলার ক্ষমতা মানুষের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই ক্ষমতার উৎস এক জটিল শারীরবৃত্তীয় কাঠামো — বাক্-যন্ত্র। এটি কোনও একক অঙ্গ নয় , বরং বহু অঙ্গের সম্মিলিত কর্মযজ্ঞ। ফুসফুসের বাতাস , কণ্ঠনালির স্বর , মুখগহ্বরের প্রতিসরণ , জিহ্বার গতি , ঠোঁটের নাচন , দাঁত ও নাসারন্ধ্রের সহযোগিতায় যে শব্দ উৎপন্ন হয় , তা-ই রূপ নেয় বাক্যে , ভাষায়। শব্দ যেন মানুষের শরীরের ভেতরে এক নিখুঁত সুরলিপির মতো জন্ম নেয় , আর উচ্চারণে মূর্ত হয় । তবে প্রশ্ন থেকে যায় — এই বিস্ময়কর ক্ষমতা কি নিছক প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফসল ? অনেক বিবর্তনবাদী বলবেন , হ্যাঁ — এটি দীর্ঘকালীন বিবর্তনেরই ফল। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন , এত সূক্ষ্ম এবং অর্থবহ এক ব্যবস্থার পেছনে কেবল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নয় , থাকতে পারে কোনও ...

হৃদয়-দর্পনে দেখা

Image
মানুষ নিজের মুখ নিজের চোখে দেখতে পারে না। আয়নায় যে মুখাবয়ব ধরা পড়ে , তা আসলে প্রতিবিম্ব — বাস্তবের একটি উল্টো , নির্জীব প্রতিলিপি। রবীন্দ্রনাথ Stray Birds - এ বলেছেন , “What you are you do not see; what you see is your shadow.” অর্থাৎ আমরা যা , তা আমাদের দৃষ্টির বাইরে ; চোখে পড়ে কেবল তার ছায়া । নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কেও এই কথাই সত্য। যতক্ষণ না তা অন্য কোথাও প্রতিফলিত হয়ে আমাদের সামনে আসে , ততক্ষণ আমরা তাকে চিনতে পারি না। তাই নিজের সৌন্দর্য দেখার জন্য প্রয়োজন হয় একটি প্রতিফলক। সেই প্রতিফলক হতে পারে আয়না — যা আলো ফেরত দেয়। কিন্তু আয়নায় আমরা আসলে কী দেখি ? যা আমরা সত্যিই , নাকি যা হতে চাই ? এই দেখাটা কি সম্পূর্ণ , নির্ভুল ? আয়না আবিষ্কারের বহু আগে মানুষ শান্ত দিঘির জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বিস্মিত হতো। চৈতন্যচরিতামৃতে আছে , পুষ্করিণীর স্বচ্ছ জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে কৃষ্ণ বিস্ময়ে বলছেন — অপরিকলিতপূর্বঃ কশ্চমৎকারকারী… আমি এত সুন্দর! এই আশ্চর্য মধুরতা আমি আগে কখনও দেখিনি। সত্যি বলতে কী , এখন আমার মনে এই মাধুর্য আস্বাদন করার প্রবল ইচ্ছে জেগেছে। কিন্তু প্রতিবিম্ব তো আস্বাদন করা যায় না...

রাজনৈতিক আকাঙক্ষার বিশ্লেষণ

Image
মানুষ অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করে — তা হল সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা , যা কখনও সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয় না। এই আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে সারা জীবন অস্থির রাখে এবং এগিয়ে যেতে প্রেরণা যোগায় । মানুষের আকাঙ্ক্ষার ধরন নানাবিধ , তবে সব আকাঙ্ক্ষাই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশিষ্ট ইংরেজ চিন্তাবিদ , দার্শনিক ও প্রবন্ধকার বার্ট্রান্ড রাসেল ১৯৫০ সালের নোবেল বক্তৃতায় চারটি আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করেন , যেগুলো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই আকাঙ্ক্ষাগুলো হল — অর্জনলিপ্সা , প্রতিদ্বন্দ্বিতা , অহমিকা এবং ক্ষমতাপ্রীতি । অর্জনলিপ্সা: অর্জনলিপ্সা হল সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের ইচ্ছা। এটি মৌলিক চাহিদা পূরণ থেকে শুরু হয়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। একটি অর্জন হলে আরেকটি চাই — এভাবেই মানুষের আকাঙ্ক্ষা বেড়ে চলে। তবে অর্জনের এই আকাঙ্ক্ষা কখনও সম্পূর্ণ তৃপ্ত হয় না , বরং নতুন নতুন লক্ষ্য তৈরি করে । প্রতিদ্বন্দ্বিতা: প্রতিদ্বন্দ্বিতার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় অর্জনলিপ্সার চেয়েও ক্ষতিকারক হতে পারে। বিশ্বের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে , প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে , ধর্মযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে , ...

স্বর্গ নরক

Image
মানুষের চিরকালের জিজ্ঞাসা — মৃত্যুর পরে আমার কী হবে ? জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার বলেছেন , ‘ মৃত্যুর পরে তুমি তা-ই হবে যা ছিলে তোমার জন্মের আগে ’ । জন্মের আগে যদি প্রকৃতির অংশ হয়ে থাকি তাহলে মৃত্যুর পরে তা-ই  হব । কারণ আমাদের দেহের সমস্ত নির্মাণ সামগ্রী আসে প্রকৃতি থেকে এবং মৃত্যুর পরে তা প্রকৃতিতে ফেরত যায় । আমাদের দেহ পৃথিবীর দান । তাই পৃথিবীতে ফেরত যায় । কিন্তু আমাদের চৈতন্য বা আত্মা স্বর্গলোকের ধন । সুতরাং মৃত্যুর পরে সকল আত্মা স্বর্গে ফেরত যাবে সেটাই স্বাভাবিক । কিন্তু বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী শুধু পুণ্যবান আত্মাই স্বর্গে যাবে, যে-কোনও আত্মা নয় । যে-মুহূর্তে তুমি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবে এবং তোমার আত্মা দেহ থেকে বের হয়ে যাবে , তোমার শরীর মরে যাবে । আর তোমার আত্মা কর্মফল অনুযায়ী স্বর্গ কিংবা নরকে যাবে । এমনটাই ধর্মশাস্ত্রের  বিধান । লক্ষণীয়, বলা হচ্ছে — বিচার হবে কৃতকর্মের নিরিখে, ধর্মবিশ্বাসের নিরিখে নয় । স্বর্গ ও নরক আমার আত্মা কত দিন স্বর্গে কিংবা নরকে থাকবে ? বলা হয় , অনন্তকাল । অনন্তকাল স্বর্গবাস সম্ভব হতে পারে নিজেকে দেবতায় রুপান্তরিত করতে পারল...

গাছের পাতা ও অনিঃশেষ জীবন

Image
গাছ ও পাতার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গাছের শাখা-প্রশাখায় উদগত সবুজ পাতা গাছের অস্তিত্বের অপরিহার্য অংশ। পাতা গাছকে জীবনশক্তি জোগায় , তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং ছায়া ও স্নিগ্ধতা প্রদান করে। গাছ ও পাতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য — গাছ পাতাকে জন্ম দেয় , আর পাতা গাছকে পূর্ণতা দেয়। এমনকি পাতা ঝরে গেলেও তাদের সম্পর্ক অটুট থাকে , কারণ ঝরে যাওয়া পাতা পরবর্তীতে গাছের জন্য সার হিসেবে কাজ করে । পাতার খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া পাতার প্রধান কাজ হল গাছের জন্য খাদ্য উৎপাদন করা। ক্লোরফিল বা পত্রহরিৎ নামক সবুজ রঞ্জক পদার্থ সূর্যের আলো শোষণ করে এবং জল ও বাতাসের সাহায্যে খাদ্য প্রস্তুত করে। তবে প্রতিকূল পরিবেশ , বিশেষত শীতকালে , দিন ছোট হয়ে আসায় আলো কমে যায় , ফলে পাতার কার্যকারিতা হ্রাস পায়। তখন গাছ পাতার সবুজ রং অপসারণ করে , আর লুকিয়ে থাকা উজ্জ্বল রং প্রকাশ পায়। এই সময় গাছে শুরু হয় এক বর্ণিল উৎসব। তবে এই রঙের খেলা বেশিদিন স্থায়ী হয় না , কারণ অবশেষে পাতা ঝরে পড়ে । পাতার বাস্পমোচন ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ পাতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল বাস্পমোচন। গাছ মাটি থেকে জল শোষণ করে এবং পাতার মাধ্যমে তা বাষ্প হিসেবে নির্গত ক...