Posts

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

Image
আধ্যাত্মিকতার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘স্পিরিচুয়ালিটি’। বর্তমান যুগে পাশ্চাত্য দুনিয়ায় এই শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। যেমন — স্পিরিচুয়ালিটি অফ ওয়ার্ক , স্পিরিচুয়ালিটি অফ লাভ , স্পিরিচুয়ালিটি অফ ডেথ , স্পিরিচুয়ালিটি অফ ন্যাচার ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে — কী এই ‘স্পিরিচুয়ালিটি’ ? ‘ স্পিরিচুয়ালিটি’ শব্দটির অর্থ যুগে যুগে বিবর্তিত হয়েছে। এক সময় স্পিরিচুয়ালিটি বলতে বোঝানো হতো কেবলই ‘ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক’ ; কিন্তু আধুনিক কালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘অন্তরাত্মার সঙ্গে সম্পর্ক’ । ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত সপ্তদশ শতাব্দীর ফ্রান্সে এক নতুন আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটে , যা বিশেষভাবে অন্তরের গভীর অনুভূতিকে স্পিরিচুয়ালিটির সঙ্গে যুক্ত করে। তখন বলা হয় , ধর্ম ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার বিষয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গির্জার অনুশাসনের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। তবে এটি অসাম্প্রদায়িক ছিল এবং নব্য-উদারপন্থী রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ । পরবর্তী সময়ে , আধ্যাত্মিক চেতনা আরও বিকশিত হয় এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ‘নিউ এইজ স্পিরিচুয়ালিটি’ নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই আন্দোলন...

অগ্রহায়ণ — নববর্ষ থেকে নবান্ন

Image
‘ ও মা , অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি , আমার সোনার বাংলা । ’ রবীন্দ্রনাথ যে সোনার বাংলার কথা বলেছেন তা মূলত অঘ্রানের বাংলা । কারণ অঘ্রান মাসে বাংলার উর্বর জমিতে সোনা ফলে । বাংলার মাঠ ছেয়ে যায় সোনালি ধানে । পরনে সোনালি পরিধান , মুখে মধুর হাসি — মায়ের এই অপরূপ রূপ দেখে বাঙালির আনন্দের সীমা থাকে না । অগ্রহায়ণ বাঙালির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস ।   মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (১৫৪০-১৬০০) বলেছেন  — ‘ ধন্য অগ্রহায়ণ মাস ,  ধন্য অগ্রহায়ণ মাস ।   বিফল জনম তার ,  নাই যার চাষ । ’   এই মাসে কৃষক ঘরে তুলে বছরের প্রধান শস্য আমন ধান ।   ঘরে ঘরে ধুম পড়ে আনন্দ উৎসবের ।   নতুন ধানের নতুন চালে তৈরি হয় নবান্ন ,  মিষ্টান্ন ।   বাংলার কৃষক মেতে উঠে উৎসবের আনন্দে । একদিন অগ্রহায়ণ ছিল বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস । নামেও তা স্পষ্ট । ‘ অগ্র ’ মানে প্রথম , ‘ হায়ন ’ মানে বছর । অর্থাৎ ‘ হায়ন ’ বা বছরের প্রারম্ভে থাকে যে মাস তার নাম অগ্রহায়ণ । অতীতে আমাদের নববর্ষের দিন ছিল পহেলা অগ্রহায়ণ । বৈশাখ কবে থেকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণ্য হল...

কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা

হেমন্ত — হেম বরণ অর্থাৎ সোনালি রঙের ঋতু ; পাকা ধানের রঙে ধন্য । হেমন্ত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ঋতুও বটে । আমরা বসন্ত ও গ্রীষ্মে যা বপন করি , হেমন্তে তার ফসল ঘরে তুলি । সেজন্য ধরিত্রী মাতাকে কৃতজ্ঞতা জানাই — নবান্ন করি , থ্যাঙ্কসগিভিং করি । তাই কৃতজ্ঞতার রং সোনালি । বলা হয়ে থাকে , কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষের হৃদয়কে সমৃদ্ধ করে । শুধু তা - ই নয় , কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষের সুস্থ জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে বলেও মনে করেন বিজ্ঞানীরা । সম্প্রতি , ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া ( বার্কলে ) ও ইউসি ( ডেভিস )- এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে , যারা প্রতিনিয়ত কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা করেন , তারা অনেক রকমের উপকার পেয়ে থাকেন । যেমন :  শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেমস এবং নিম্ন রক্তচাপ  উচ্চ স্তরের ইতিবাচক আবেগ  অধিক আনন্দ , আশাবাদ , ও সুখবোধ  অধিক ঔদার্য ও সমবেদনা  অপেক্ষাকৃত কম একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রত্যেক মানুষের জীবনে সাফল্য ও ভাল থাকার পিছনে থাকে অন্য কিছু মানুষের অবদান । সর্বোপরি থাকেন জগদীশ্বর । তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা যেতে পারে । প্রকৃতির রূপ , রস , সৌন্দর্য...

নার্সিসাস — রূপান্তরিত ফুলের রূপকথা

Image
মানুষের দেহকোষে থাকে দুই ধরনের ক্রোমোসোম — স্ত্রী-ক্রোমোসোম এবং পুং-ক্রোমোসোম। একজন নারীর শরীরে থাকে কেবলমাত্র স্ত্রী-ক্রোমোসোম , ফলে তিনি জৈবিকভাবে সম্পূর্ণ নারী। অন্যদিকে একজন পুরুষের শরীরে একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে পুং ও স্ত্রী — যেন তিনি অর্ধনারীশ্বরের এক জীবন্ত রূপ ; তাঁর ভিতরেই অদৃশ্যভাবে বাস করে নরশক্তি ও নারীশক্তি। নর ও নারীর মধ্যে যেমন প্রেম জন্ম নেয় , তেমনি মানুষের নিজের মধ্যস্থিত দুই শক্তির মধ্যেও কখনও কখনও প্রেমে আবিষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে — একে বলা যায় আত্মরতি বা আত্মপ্রেম। এই আত্মরতির এক মনোজাগতিক প্রতিমূর্তি আমরা দেখতে পাই গ্রিক পুরাণে । গ্রিক পুরাণে বর্ণিত আছে নার্সিসাস নামের এক অতুল সুন্দর যুবকের কাহিনি। একদিন সে দিঘির স্বচ্ছ জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে বিস্ময়ে স্থির হয়ে যায় , এবং ধীরে ধীরে নিজের রূপেই প্রেমে পড়তে শুরু করে। সে প্রেম এতই প্রবল , এতই তীব্র , যে সে নিজের সঙ্গে রতিমিলনের আকাঙ্ক্ষায় উন্মত্ত হয়ে উঠে। কিন্তু মানবদেহ আত্মরতির জন্য নির্মিত নয় ; তাই তার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার আগুনে দগ্ধ হয়ে অবশেষে সে মৃত্যুবরণ করে — তার দেহ ছাই হয়ে মিশে যায় ...

পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে বাস্তবতা: কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও রবীন্দ্রনাথ

Image
আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই , চাঁদকে দেখতে পাই। কিন্তু যখন তাকাই না , তখনও কি চাঁদ সেখানে থাকে ? এই প্রশ্নটি তুলেছিলেন বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। কারণ , সে সময় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নতুন শাখায় ‘অবজারভার ইফেক্ট’ বা ‘ পর্যবেক্ষক প্রভাব ’ নামক একটি তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা চলছিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী , কোনও বস্তুর অবস্থা বা দশা নির্ধারিত হয় একজন সচেতন পর্যবেক্ষকের উপস্থিতির ভিত্তিতে। পর্যবেক্ষণ শুধু তথ্য সংগ্রহই করে না , বরং বাস্তবতার প্রকৃতিতেও প্রভাব ফেলে । এই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় রহস্য — দেখবার বস্তুটি নয় , যে দেখে সেই মানুষটি।’ সম্ভাবনা পর্যায়ের চাঁদ প্রশ্ন জাগে — যখন আমরা চাঁদের দিকে তাকাই না , তখনও কি চাঁদ সেখানে থাকে ? কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে , এই প্রশ্নের উত্তর হল: আমাদের দৃষ্টির আড়ালে যাওয়া মাত্রই চাঁদের অস্তিত্ব এক অনির্ধারিত সম্ভাবনার পর্যায়ে চলে যায়। কারণ , একজন সচেতন পর্যবেক্ষকের অনুপস্থিতিতে বস্তু প্রকৃত অর্থে নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকে না , বরং সম্ভাবনার একাধিক রূপে বিরাজ করে । এটি হয়তো অবিশ্বা...

আসব যাব চিরদিনের সেই আমি

Image
১৯৪১ সালের ২২ শ্রাবণ । সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুশয্যায় । জীবনের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত । চলছে অবিরাম মন্ত্রোচ্চারণ — শান্তং শিবং অদ্বৈতম্ । কবি নিমীলিত নেত্রে ধ্যানমগ্ন । একজন শুভার্থী রবীন্দ্রনাথকে পরামর্শ দিলেন — ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন , এটাই যেন হয় আপনার শেষ জীবন , আর যেন ফিরে আসতে না হয় এই দুর্দশাগ্রস্ত পৃথিবীতে । রবীন্দ্রনাথ চোখ খুললেন । রাগান্বিত কণ্ঠে বললেন , চুপ করুন , আমি প্রার্থনা করছি — হে ঈশ্বর , যে - জীবন তুমি আমাকে দিয়েছ তা এত সুন্দর যে , এই দান তুমি আমাকে বারবার দাও । আমি আবার দেখতে চাই সূর্যোদয় , সূর্যাস্ত , তারকাশোভিত রাত , ফুল , ডানামেলা পাখি , গাছ , নদী , পর্বত , মানুষ , ... । আমি ফিরে আসতে চাই বারবার , আরও বহুবার । এই পৃথিবী এত বিশাল , এত অফুরান প্রাচুর্যে পূর্ণ যে , আমার কাছে তা কোনও  দিনও  দীনহীন মনে হয়নি , পুরাতন মনে হয়নি । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রয়াত হয়েছেন প্রায় আশি বছর হয়ে এল । ইতিমধ্যে তিনি অন্য কোনও পরিচয়ে ফিরে এসেছেন কি না তা কেউ জানে না । তবে কবির ফিরে আসার সেই আকাঙ্ক্ষা আজও ব্যক্ত হয় তাঁর গানে: আবার যদ...