কেন আঁধার বিছানো রাতের আকাশ
ওলন্দাজ চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যান গগ-এর বিখ্যাত
চিত্রকর্ম দ্য স্টারি নাইট-এ রাতের আকাশ
যেন আলোয় ভরা — নক্ষত্রের ঘূর্ণি, আকাশের নীলাভ দীপ্তি, এক স্বপ্নময়
উজ্জ্বলতা। কিন্তু বাস্তব রাতের আকাশ তেমন নয়। বাস্তবে রাতের আকাশ প্রকৃতপক্ষেই
কালো — আঁধার বিছানো।
অথচ এই আঁধারের মধ্যেই জ্বলছে লক্ষ কোটি নক্ষত্র।
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা আকাশগঙ্গা
ছায়াপথেই রয়েছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। আর সমগ্র মহাবিশ্বে রয়েছে সম্ভবত ১০০
বিলিয়ন গ্যালাক্সি — প্রতিটি গ্যালাক্সিতেই আবার অগণিত নক্ষত্র। এত অসংখ্য সূর্য
একসঙ্গে জ্বলছে আকাশে, তবু কেন রাতের আকাশ আলোঝলমলে নয়? কেন এই গভীর, নীরব অন্ধকার?
![]() |
| সম্প্রসারমান ব্রহ্মান্ড |
ডপ্লার ইফেক্ট বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ ধরা
যাক। মনে করুন, ঝুম বৃষ্টির মধ্যে আপনি মাথার উপর ছাতা ধরে হাঁটছেন। ধীরে হাঁটলে ছাতাটি থাকে
ঠিক মাথার উপর। হাঁটার গতি বাড়ালে লক্ষ্য করবেন, ছাতাটি একটু সামনের দিকে হেলিয়ে ধরতে হচ্ছে। আর
যখন দৌড়াতে শুরু করেন, তখন অজান্তেই ছাতাটি মাথার উপর থেকে সরিয়ে বুকের
সামনে মেলে ধরেন। যেন বৃষ্টি আর মাথার উপর পড়ছে না — পড়ছে বুকের দিকে!
অথচ বাস্তবে বৃষ্টির দিক তো বদলায়নি। বৃষ্টি
আগের মতোই উপর থেকে সোজা নীচে পড়ছে। তবু এমন কেন মনে হয়? কারণ, আপনি নিজেই
বৃষ্টির দিকে ছুটে চলেছেন। আপনার গতির কারণে বৃষ্টিজলের ঝাপটা পিছনের দিকে কমে
গিয়ে সামনের দিকে বেশি অনুভূত হচ্ছে। অবচেতন মনেই আপনি ডপ্লার ইফেক্টের নিয়ম মেনে
ছাতার অবস্থান বদলে নিচ্ছেন।
জলের তরঙ্গ, শব্দের তরঙ্গ, এমনকী আলোর তরঙ্গ — সব তরঙ্গই ডপ্লার ইফেক্টের
অধীন। যখন কোনও তরঙ্গ আমাদের দিকে এগিয়ে আসে, অথবা আমরা সেই তরঙ্গের দিকে এগোই, তখন তরঙ্গের
দৈর্ঘ্য কমে যায়। তরঙ্গের দৈর্ঘ্য কমলে কম্পনের সংখ্যা বেড়ে যায় — ফলে শব্দ
তীক্ষ্ণ শোনায়, আলো বেশি উজ্জ্বল লাগে।
অন্যদিকে, যখন কোনও তরঙ্গ আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, অথবা আমরা তরঙ্গ
থেকে দূরে সরে যাই, তখন তরঙ্গের দৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। এর ফলে কম্পন কমে, আর শব্দ বা আলোর
তীব্রতা আমাদের কাছে ম্লান হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতাই ডপ্লার ইফেক্ট। তাই তো পুলিশ ভ্যান
বা অ্যাম্বুলেন্স যখন সাইরেন বাজিয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসে, তখন শব্দ
তীক্ষ্ণ ও চড়া লাগে; আর যখন আমাদের পিছনে ফেলে দূরে সরে যায়, তখন সেই একই
সাইরেনের শব্দ ম্লান হয়ে যায়।
ঠিক একই কারণে সদাসম্প্রসারমান মহাবিশ্বের
গ্যালাক্সিগুলো যখন তাদের নক্ষত্ররাজি নিয়ে আমাদের থেকে দূরে ছুটে চলেছে, তখন সেই
নক্ষত্রের আলোও আমাদের চোখে দুর্বল হয়ে পৌঁছয়। আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রসারিত হয়ে পড়ে
— লালদিকে সরে যায় (রেডশিফট) — এবং অনেক আলো আমাদের চোখে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে
যায় মহাশূন্যের বিস্তারে।
ফলাফল — রাতের আকাশ অন্ধকার।
