অবচেতন মন : সময়, স্মৃতি ও স্বপ্ন
এখন সময় কত — এই প্রশ্নটি সম্ভবত সারাদিনে
আমাদের মনে সবচেয়ে বেশি বার জাগে। কারণ সময়সূচির অদৃশ্য শেকলে বাঁধা আমাদের
প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজ। অফিস, ট্রেন, সভা, আহার, নিদ্রা — সব কিছুরই নির্ধারিত সময় আছে। কিন্তু
প্রশ্ন থেকে যায় — সময় আসলে কী? আমরা কি সত্যিই সময়কে জানি, না কেবল তাকে
মাপি?
সাধারণভাবে আমরা সময় বলতে বুঝি ঘড়ির কাঁটার
অবস্থান। অথচ ঘড়ি তো সময়ের উৎস নয় — সে কেবল সময় মাপার একটি যন্ত্র। তাহলে
সময়ের প্রকৃত অস্তিত্ব কোথায়? সময় কি সর্বত্র একই রকম? নাকি মানুষের
অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ বদলে যায়?
পঞ্চম শতকের খ্যাতনামা ধর্মতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক
অগাস্টিন অফ হিপ্পো একবার বলেছিলেন —
“কেউ যদি আমাকে
না জিজ্ঞাসা করে, আমি জানি সময় কী; কিন্তু যদি কেউ জানতে চায়, আমি আর বলতে পারি না।”
এই আপাতবিরোধী উক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সময়ের
গভীর দর্শন। অগাস্টিন আসলে ইঙ্গিত করেছিলেন যে, সময় কোনও বস্তুগত সত্তা নয় — এ এক ব্যক্তিগত
অনুভূতি, একান্ত
অভিজ্ঞতা। আমরা সময়কে অনুভব করতে পারি, কিন্তু তাকে নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলতে
পারি না। এই অর্থে সময় সাবজেক্টিভ — তার অস্তিত্ব মানুষের চেতনার ভেতরেই নিহিত।
উনবিংশ শতকের শেষভাগে ফরাসি দার্শনিক হেনরি
বার্গসোঁ এই ধারণাকে আরও সুস্পষ্ট করেন তাঁর ‘দ্বৈত সময়’-তত্ত্বে। ১৮৯৬ সালে তিনি
বলেন, সময় মূলত দুই
প্রকার —
একটি হল অবজেক্টিভ বা বস্তুগত সময়, যা ঘড়ি ও
ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে পরিমাপযোগ্য এবং মানুষের অনুভূতি থেকে স্বাধীন। অন্যটি হল
সাবজেক্টিভ বা মনোগত সময় — যার অস্তিত্ব নির্ভর করে স্মৃতির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের
ওপর। এই মনোগত সময়কে মাপা যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।
![]() |
দ্য পার্সিস্টেন্স অব মেমরি/দালি |
নিদ্রার সময় বাহ্যিক জগতের সঙ্গে আমাদের
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় — তাই পকেটঘড়িটি থেমে থাকে। কিন্তু তখন সক্রিয় হয়ে
ওঠে দেহের অভ্যন্তরীণ সময় — অবচেতন মনের ঘড়ি। এই সময় কোনও সরল রেখায় প্রবাহিত
হয় না, ঘড়ির কাঁটার
আবর্তনে তাকে ধরা যায় না। সে জানে না ‘অতীত’ কিংবা ‘ভবিষ্যৎ’ কী — সে চেনে কেবল
এক চিরবর্তমান। এই সময় মানুষকে সময়সূচির অনুশাসনে বেঁধে রাখে না; সে নমনীয়, প্রবহমান — ঠিক
যেমন দালির ঘড়িগুলি।
সচেতন মন চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে, সিদ্ধান্ত নেয় —
কিন্তু তার নিজের কোনও স্মৃতি নেই। সমস্ত স্মৃতি সঞ্চিত থাকে অবচেতন মনের গভীরে।
অবচেতন মন এক বিশাল স্মৃতিভাণ্ডার — শুধু এই জীবনের স্মৃতিই নয়, অনেকের বিশ্বাস
অনুযায়ী পূর্বজন্মের স্মৃতিও। নিদ্রার সময়, যখন সচেতন মনের শাসন লুপ্ত হয়, তখন অবচেতন মন
সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে স্মৃতিখণ্ডগুলিকে নতুন বিন্যাসে সাজিয়ে স্বপ্ন রচনা করে।
