রাসলীলা : অন্তরলীলার মহিমা

আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি, নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান’ — যেন এমনই এক দিব্য আহ্বান ধ্বনিত হয়েছিল শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে, কার্তিকী পূর্ণিমার এক নীরব শারদরাত্রিতে। সেই সুর ছিল না কেবল সংগীত; তা ছিল অন্তরের অন্তঃস্থলে স্পর্শ করা এক দিব্য ডাক। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বৃন্দাবনের গোপীগণ লৌকিক বন্ধন ভুলে ছুটে গিয়েছিলেন অরণ্যের অভিসারে

ras leela

সেদিনের বৃন্দাবন ছিল এক অলৌকিক পরিবেশে আবিষ্ট — পূর্ণিমার ধবল জ্যোৎস্নায় স্নাত, কদমতরুর ছায়ায় নিবিড়, নিস্তব্ধ অথচ সুরময়। প্রকৃতি যেন নিজেই প্রস্তুত হয়েছিল এক মহালীলার মঞ্চ হয়ে উঠতে। গোপী-পরিবেষ্টিত শ্রীকৃষ্ণ সেই রাত্রিতে প্রবৃত্ত হলেন রাসনৃত্যে — প্রেম, সুর ও চেতনার এক অনুপম সমবায়ে

কথিত আছে, সেই লীলায় পীতাম্বরধারী কৃষ্ণ নিজের অনেকগুলো প্রতিরূপ সৃষ্টি করেছিলেন। রাসমন্ডলে যত গোপী, তত কৃষ্ণরূপ — প্রত্যেকের সঙ্গে পৃথক, অথচ একই সঙ্গে একাত্ম। কোনও গোপীর মনে হল না যে তিনি বঞ্চিত; প্রত্যেকেই অনুভব করলেন, কৃষ্ণ কেবল তাঁরই। এক কৃষ্ণ, বহু প্রকাশ — এই বিস্ময়ের মধ্যেই নিহিত আছে রাসলীলার রূপক-সত্য

আকাশে চাঁদ একটিই, কিন্তু অসংখ্য জলাশয়ে তার প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে। তেমনই পরমসত্তা এক, কিন্তু অসংখ্য হৃদয়ে তাঁর প্রতিফলন হতে পারে। রাসলীলার এই ব্যাখ্যা আমাদের জানায় — ঈশ্বর ব্যক্তিগতও, সর্বজনীনও। তিনি একই সঙ্গে একান্ত ও সর্বব্যাপী

স্বামী বিবেকানন্দ রাসলীলার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন — “Raas Leela is an external expression of divine leela which takes place in the heart of each and every individual, between the finite and the universal soul.” অর্থাৎ, সীমিত আত্মা ও সর্বব্যাপী আত্মার অন্তর্লীলার বহিঃপ্রকাশই রাসলীলা

ভক্তি সাহিত্যে এই ভাবনারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত চৈতন্যচারিতামৃতের গীত

অন্যের হৃদয় মন, আমার মন বৃন্দাবন,
মনে বনে এক করি জানি।”

এই গীত আমাদের স্মরণ করায় — প্রকৃত বৃন্দাবন ভৌগোলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; তা ভক্তের হৃদয়ভূমি। মনই বৃন্দাবন, হৃদয়ই রাসমন্ডল। বাহিরের লীলা আসলে অন্তরের চৈতন্য-উন্মেষের প্রতীক

অতএব, রাসলীলা কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়; এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপক। গোপীরা এখানে মানুষের আত্মার আকুলতার প্রতীক, আর কৃষ্ণ সেই চিরন্তন চৈতন্য, যিনি প্রত্যেক আত্মার সঙ্গে একান্ত সম্পর্ক স্থাপন করেন। প্রেম এখানে ভক্তি, নৃত্য এখানে আত্মসমর্পণ, আর রাসমন্ডল এখানে ঐক্যের বৃত্ত

মানুষ যখন তার অহং ত্যাগ করে প্রেমের সর্বজনীন স্রোতে নিজেকে সমর্পণ করে, তখনই তার অন্তরে শুরু হয় সেই দিব্য নৃত্য। তখন জীবন হয়ে ওঠে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত শারদরাত্রি, আর হৃদয় — এক চিরন্তন বৃন্দাবন

এই উপলব্ধিই রাসলীলার প্রকৃত মাহাত্ম্য — বহুর মধ্যে একের দর্শন, আর একের মধ্যে বহুর প্রকাশ; ব্যক্তির মধ্যে বিশ্বচৈতন্যের দীপ্ত অভিব্যক্তি। এখানেই রাসলীলার রস, এখানেই তার অনন্ত আনন্দ

অসীম দে
গুয়েল্ফ, অন্টারিও, কানাডা 

Popular posts from this blog

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ চেনার উপায়

সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ — সৃষ্টিতত্ত্বের মূলভাব

অমাবস্যা ও পূর্ণিমা : চন্দ্রসূর্যের মিলন ও বিরহ তিথি

তেলের সামাজিক মাহাত্ম্য

ঈশ্বর, প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

সূর্য উপাসনা

হৃদয়-দর্পনে দেখা