রাসলীলা : অন্তরলীলার মহিমা
সেদিনের বৃন্দাবন ছিল এক অলৌকিক পরিবেশে আবিষ্ট — পূর্ণিমার ধবল
জ্যোৎস্নায় স্নাত, কদমতরুর ছায়ায় নিবিড়, নিস্তব্ধ অথচ সুরময়। প্রকৃতি যেন
নিজেই প্রস্তুত হয়েছিল এক মহালীলার মঞ্চ হয়ে উঠতে। গোপী-পরিবেষ্টিত শ্রীকৃষ্ণ সেই
রাত্রিতে প্রবৃত্ত হলেন রাসনৃত্যে — প্রেম, সুর ও চেতনার এক অনুপম সমবায়ে।
কথিত আছে, সেই লীলায় পীতাম্বরধারী কৃষ্ণ নিজের অনেকগুলো প্রতিরূপ সৃষ্টি করেছিলেন।
রাসমন্ডলে যত গোপী, তত কৃষ্ণরূপ — প্রত্যেকের সঙ্গে পৃথক, অথচ একই সঙ্গে
একাত্ম। কোনও গোপীর মনে হল না যে তিনি বঞ্চিত; প্রত্যেকেই অনুভব করলেন, কৃষ্ণ
কেবল তাঁরই। এক কৃষ্ণ, বহু প্রকাশ — এই বিস্ময়ের মধ্যেই নিহিত আছে রাসলীলার রূপক-সত্য।
আকাশে চাঁদ একটিই, কিন্তু অসংখ্য জলাশয়ে তার প্রতিবিম্ব
ফুটে ওঠে। তেমনই পরমসত্তা এক, কিন্তু অসংখ্য হৃদয়ে তাঁর প্রতিফলন হতে
পারে। রাসলীলার এই ব্যাখ্যা আমাদের জানায় — ঈশ্বর ব্যক্তিগতও, সর্বজনীনও।
তিনি একই সঙ্গে একান্ত ও সর্বব্যাপী।
স্বামী বিবেকানন্দ রাসলীলার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন — “Raas Leela is an external expression of divine leela which takes place
in the heart of each and every individual, between the finite and the universal
soul.” অর্থাৎ, সীমিত আত্মা ও সর্বব্যাপী আত্মার অন্তর্লীলার বহিঃপ্রকাশই রাসলীলা।
ভক্তি সাহিত্যে এই ভাবনারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। কৃষ্ণদাস
কবিরাজ রচিত চৈতন্যচারিতামৃতের
গীত —
“অন্যের
হৃদয় মন, আমার
মন বৃন্দাবন,
মনে বনে এক করি জানি।”
এই গীত আমাদের স্মরণ করায় — প্রকৃত বৃন্দাবন ভৌগোলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; তা
ভক্তের হৃদয়ভূমি। মনই বৃন্দাবন, হৃদয়ই রাসমন্ডল। বাহিরের লীলা আসলে
অন্তরের চৈতন্য-উন্মেষের প্রতীক।
অতএব, রাসলীলা কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনি নয়; এটি এক গভীর
আধ্যাত্মিক রূপক। গোপীরা এখানে মানুষের আত্মার আকুলতার প্রতীক, আর
কৃষ্ণ সেই চিরন্তন চৈতন্য, যিনি প্রত্যেক আত্মার সঙ্গে একান্ত সম্পর্ক স্থাপন করেন। প্রেম এখানে
ভক্তি, নৃত্য
এখানে আত্মসমর্পণ, আর রাসমন্ডল এখানে ঐক্যের বৃত্ত।
মানুষ যখন তার অহং ত্যাগ করে প্রেমের সর্বজনীন স্রোতে নিজেকে সমর্পণ
করে, তখনই
তার অন্তরে শুরু হয় সেই দিব্য নৃত্য। তখন জীবন হয়ে ওঠে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত
শারদরাত্রি, আর হৃদয় — এক চিরন্তন বৃন্দাবন।
