কৃতজ্ঞতা : জীবনের সোনালি ফসল
হেমন্ত — ‘হেম’ অর্থাৎ সোনালি রঙের ঋতু; পাকা ধানের রঙে
ধন্য এক সময়। বাংলার মাঠঘাটে তখন সোনালি শস্যের ঢেউ ওঠে, আর
প্রকৃতি যেন প্রাচুর্যের উজ্জ্বল পরিধানে সেজে ওঠে। এই হেমন্ত কেবল
ফসল তোলার ঋতু নয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ঋতুও বটে। বসন্ত ও গ্রীষ্মে আমরা যা বপন করি, হেমন্তে
তারই ফসল ঘরে তুলি। সেই প্রাচুর্যের আনন্দে মানুষ ধরিত্রী মাতাকে কৃতজ্ঞতা জানায় —
নবান্ন উৎসব করে, নানা দেশে পালন করে থ্যাঙ্কসগিভিং। যেন প্রকৃতির কাছে মাথা নত করে
মানুষ বলে — তোমার দানেই আমাদের জীবন। তাই কৃতজ্ঞতার রংও যেন সোনালি — ফসলের রঙে
দীপ্ত, তৃপ্তির
আলোয় উজ্জ্বল।
অনেকদিন ধরেই বলা হয়ে আসছে, কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষের হৃদয়কে সমৃদ্ধ
করে। কৃতজ্ঞতা মানুষের মনকে প্রসারিত করে, অহংকারকে নম্রতায় রূপান্তরিত করে এবং
জীবনের প্রতি গভীর উপলব্ধি এনে দেয়। আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানও এই
প্রাচীন মানবিক সত্যকে নতুন করে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, কৃতজ্ঞতাবোধ
কেবল নৈতিক বা আধ্যাত্মিক গুণ নয়; এটি মানুষের সুস্থ ও সুখী জীবনযাপনেরও
একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে
এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস–এর
যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা করেন, তারা
শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই নানা ইতিবাচক ফল লাভ করেন। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী
কৃতজ্ঞতাবোধের কিছু উল্লেখযোগ্য উপকারিতা হল —
- অধিক
শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং তুলনামূলকভাবে নিম্ন রক্তচাপ
- ইতিবাচক
আবেগের উচ্চতর উপস্থিতি
- অধিক আনন্দ, আশাবাদ ও সুখবোধ
- মানুষের
প্রতি বেশি ঔদার্য, সহমর্মিতা
ও সমবেদনা
- তুলনামূলকভাবে
কম একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি
অর্থাৎ কৃতজ্ঞতা শুধু হৃদয়ের সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে না; এটি
মানুষের জীবনকে সুস্থ, ভারসাম্যপূর্ণ ও আনন্দময় করতেও সাহায্য করে।
বাস্তবে, প্রত্যেক মানুষের জীবনের সাফল্য ও ভাল থাকার পেছনে অনেক অদৃশ্য অবদান
জড়িয়ে থাকে। আমাদের শিক্ষক, বন্ধু, পরিবার — এমনকী অচেনা অনেক মানুষের সহায়তা ও প্রেরণাও আমাদের জীবনের
পথ নির্মাণ করে। সর্বোপরি, অনেকেই বিশ্বাস করেন যে এই সমস্ত প্রাপ্তির অন্তরালে রয়েছেন জগদীশ্বর
বা কোনও মহাজাগতিক কল্যাণশক্তি। তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা মানুষের এক
গভীর মানবিক দায়িত্ব।
কৃতজ্ঞতার ক্ষেত্র কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি
প্রসারিত হতে পারে সমগ্র প্রকৃতির প্রতি। প্রকৃতির রূপ, রস, সৌন্দর্য
ও ঐশ্বর্যের জন্য আমরা কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি প্রকৃতিমাতাকে। প্রতিদিনের নতুন ভোরের
জন্য সূর্যকে, নির্মল বাতাসের জন্য আকাশকে, কিংবা জীবনধারণের খাদ্যের জন্য মাটিকে
ধন্যবাদ জানানো যায়। এই কৃতজ্ঞতা মানুষের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক
গড়ে তোলে।
তবে প্রকৃত কৃতজ্ঞতা উচ্চকণ্ঠ ঘোষণায় নয়; তা
প্রকাশ পায় নিভৃত অন্তরের গভীরে। কৃতজ্ঞতা অনেক সময় ভাষাহীন অনুভূতি — একটি নীরব
স্বীকারোক্তি। এই কথাটিই অসাধারণ কাব্যিকতায় প্রকাশ করেছেন রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর। তাঁর ভাষায় —
“দয়া বলে, কে গো তুমি মুখে নাই কথা?
অশ্রুভরা আঁখি বলে, আমি কৃতজ্ঞতা।”
এই পংক্তির মধ্যেই কৃতজ্ঞতার প্রকৃত রূপ ধরা পড়ে। কৃতজ্ঞতা মুখের
উচ্চারণে নয়, হৃদয়ের গভীর স্পর্শে প্রকাশিত হয়; কখনও তা অশ্রুভরা চোখের নীরব ভাষায়
ফুটে ওঠে।
যখন প্রতিদিনের ধ্যান, প্রার্থনা বা মননচর্চার মধ্যে
কৃতজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন কৃতজ্ঞতা আর কোনও বিশেষ ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন শুধু
হেমন্ত নয় — প্রতিটি ঋতুই হয়ে ওঠে কৃতজ্ঞতার ঋতু। প্রতিটি দিনই হয়ে ওঠে এক একটি
‘থ্যাঙ্কসগিভিং ডে’।
তখন জীবনের সাধারণ দিনগুলিও নতুন অর্থ পায়। সূর্যোদয়ের আলো, একটি
সুস্থ শ্বাস, কিংবা প্রিয়জনের একটি হাসিও তখন মনে হয় অমূল্য উপহার। সেই উপলব্ধির
আলোয় জীবন ধীরে ধীরে সোনালি হয়ে ওঠে।
তাই বলা যায়, কৃতজ্ঞতাবোধের চর্চা আসলে জীবনের সৌন্দর্য আবিষ্কারের এক সহজ পথ। এই চর্চা মানুষকে বিনম্র করে, সংযুক্ত করে এবং হৃদয়কে সমৃদ্ধ করে। আর যখন মানুষ কৃতজ্ঞ হতে শেখে, তখন তার প্রতিটি দিনই হয়ে ওঠে এক-একটি সোনালি দিন। ▣