স্বপ্নলোকের চাবি

স্বপ্নলোক — এমন এক জগত্‍, বাস্তবের সীমা অতিক্রম করে হৃদয়ের অন্তরালেই যেন তার অবস্থান। সেখানে পৌঁছানো যায় না পায়ের পথ ধরে, বরং হৃদয়ের অদৃশ্য সেতু পেরিয়ে যেতে হয়। তবু আজ মনে হয়, সেই অন্তর্জগতের পথ যেন ক্রমে আবছা হয়ে যাচ্ছে — যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে সেখানে প্রবেশের গোপন চাবি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর এক কবিতায় এই হারিয়ে যাওয়ার ব্যথাকেই ভাষা দিয়েছেন —

স্বপন-পারের ডাক শুনেছি, জেগে তাই তো ভাবি —
কেউ কখনো খুঁজে কী পায় স্বপ্নলোকের চাবি
নয় তো সেথায় যাবার তরে, নয় কিছু তো পাবার তরে,
নাই কিছু তার দাবি —
বিশ্ব হতে হারিয়ে গেছে স্বপ্নলোকের চাবি।’

এই পঙ্‌ক্তিগুলিতে এক অদ্ভুত দ্বৈততা কাজ করে — ডাক আছে, আকর্ষণ আছে, কিন্তু নেই পৌঁছানোর উপায়। যেন মানবজীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি — আমরা জানি, কোথাও এক অপূর্ব জগৎ আছে, কিন্তু তার দরজা খুলে দেওয়ার চাবিটি যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। তাই মানুষ অবিরাম খুঁজে বেড়ায় — কোথাও, কোনও এক অজানা আলোর ভুবনে লুকিয়ে আছে সেই রহস্যময় চাবি। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় — এই চাবি কি সত্যিই বাইরে কোথাও হারিয়েছে, নাকি আমাদের খোঁজার দিকটাই ভুল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনে পড়ে এক পুরোনো রম্যগল্প — মধ্যযুগের প্রজ্ঞাময় দার্শনিক মোল্লা নাসিরুদ্দিন-এর কাহিনি

একদিন দেখা গেল, মোল্লা তাঁর বাড়ির সামনের আঙিনায় কিছু একটা খুঁজছেন। এক প্রতিবেশী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল —
কী খুঁজছেন, মোল্লা?
চাবি

সহমর্মিতাবশত প্রতিবেশীও খোঁজাখুঁজিতে যোগ দিল। অনেকক্ষণ পরও চাবি না পেয়ে সে আবার জিজ্ঞেস করল —
চাবিটা কোথায় হারিয়েছেন?
মোল্লা শান্ত স্বরে বললেন —
ঘরের ভেতরে
তাহলে বাইরে খুঁজছেন কেন?
মোল্লার নির্লিপ্ত উত্তর —
কারণ ভেতরে অন্ধকার, আর বাইরে আলো বেশি

প্রথম শুনলে গল্পটি নিছক হাস্যরসের মনে হয় — যেন যুক্তিহীন এক অদ্ভুত আচরণ। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মানবজীবনের এক গভীর সত্য। আমরা প্রায়ই যা হারাই নিজের অন্তরে, তা খুঁজতে যাই বহির্জগতে — কারণ বাইরে আলো আছে, দৃশ্যমানতার সহজতা আছে; অথচ ভেতরের অন্ধকারে প্রবেশ করার সাহস আমাদের কম

এই কারণেই ‘স্বপ্নলোকের চাবি’ আমাদের কাছে অদৃশ্য হয়ে যায়। আমরা তাকে খুঁজি বাহিরের জৌলুসে — সম্পদে, সাফল্যে, প্রতিষ্ঠায়, কিংবা বাহ্যিক আনন্দে। কিন্তু যেটি প্রকৃতপক্ষে অন্তর্লৌকিক, তাকে বাহিরের আলোর মধ্যে পাওয়া সম্ভব নয়। মোল্লার এই খোঁজা তাই নিছক এক চাবির অনুসন্ধান নয় — এ যেন মানবসত্তার প্রতীকী ভ্রমণ

খুঁজে পাওয়ার চেয়ে খুঁজে বেড়ানোর মধ্যেই যেন এক ধরনের অস্তিত্বগত আনন্দ লুকিয়ে থাকে। যেমন বাউল সাধক তাঁর ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধানে সারাজীবন পথ চলেন। সেই খোঁজা কোনও অভাবের তাড়নায় নয়; বরং স্বভাবের টানে — এক অন্তহীন আকর্ষণের বশে

বাউল-দর্শনের অন্তর্লীন বাণী যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় —
যে জন বিরাজ করে আপন হৃদিমাঝারে,
সেই নিয়েছে চুরি করে স্বপ্নলোকের চাবি।

এই পঙ্‌ক্তির অন্তর্নিহিত অর্থ গভীর — যার খোঁজে আমরা দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াই, সে আসলে আমাদের নিজের ভেতরেই অবস্থান করছে। স্বপ্নলোকের চাবি কোনও বস্তুগত উপকরণ নয়; এটি এক অন্তরজাগতিক প্রতীক — আত্মচেতনার, অনুভবের, এবং অন্তরের জাগরণের

বাইরের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, সেই চাবির সন্ধান সেখানে মেলে না। তাকে পেতে হলে অবধারিতভাবে প্রবেশ করতে হয় নিজের অন্তরলোকের নীরব অন্ধকারে — সেখানে, যেখানে শব্দ থেমে যায়, অথচ অর্থ জেগে ওঠে; যেখানে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করে, নতুন করে চিনতে শেখে

এই উপলব্ধি একবার জাগ্রত হলে খোঁজার প্রকৃতি বদলে যায়। তখন আর মানুষ বাইরে ছুটে বেড়ায় না; বরং নিজের গভীরে যাত্রা শুরু করে। তখন স্বপ্নলোক কোনও দূরবর্তী, অলৌকিক জগৎ নয় — তা হয়ে ওঠে অন্তরেরই এক উন্মুক্ত প্রান্তর, যেখানে প্রবেশের জন্য আলাদা কোনও চাবির প্রয়োজন পড়ে না

অতএব, স্বপ্নলোকের চাবি আসলে হারিয়ে যায়নি — হারিয়ে গেছে কেবল আমাদের দৃষ্টির দিশা। আমরা যে দিকে তাকিয়ে আছি, চাবিটি সে দিকে নেই। আর যেদিকে তাকাতে ভয় পাই — সেই অন্তরলোকেই সে নীরবে অপেক্ষা করে আছে

যে মুহূর্তে মানুষ সেই দিশা ফিরে পায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার উপলব্ধি হয় —
চাবি কখনওই বাইরে ছিল না;

তা গভীর, নিঃশব্দে,

নিজের মধ্যেই অনন্তকাল ধরে জেগে ছিল।

✍অসীম দে

গুয়েল্ফ, অন্টারিও, কানাডা

Popular posts from this blog

শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ চেনার উপায়

সীমার মাঝে অসীমের প্রকাশ — সৃষ্টিতত্ত্বের মূলভাব

অমাবস্যা ও পূর্ণিমা : চন্দ্রসূর্যের মিলন ও বিরহ তিথি

তেলের সামাজিক মাহাত্ম্য

ঈশ্বর, প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

রাসলীলা : অন্তরলীলার মহিমা

আঁধারের রূপ ও বিপন্নতা

আধ্যাত্মিকতা — পাশ্চাত্য ভাবধারার আলোকে

সূর্য উপাসনা

হৃদয়-দর্পনে দেখা