কালাতীত কালী : সময় ও মৃত্যুর অতল রহস্য
কার্তিকের অমানিশা। নিবিড়, অলৌকিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন চরাচর।
আকাশের নক্ষত্ররাজি নৈঃশব্দ্যের সুরে স্থির, যেন মহাকালের গভীর স্পন্দন শুনছে। এই
গাঢ় অন্ধকারের অন্তঃস্থ উৎস থেকেই যেন উদ্ভাসিত হন জ্যোতির্ময়ী দেবী কালী — মুক্তকেশী, ত্রিনয়নী, দিগবসনা।
তাঁর সাধনায় নিমগ্ন হয় ভক্তমন। কিন্তু কে এই কালী? তাঁর রূপের
অন্তর্নিহিত দর্শনই বা কী?
কালী দেবীমণ্ডলীর মধ্যে স্বতন্ত্র। তিনি একই সঙ্গে ভয়ংকর ও মমতাময়ী।
এক হাতে খড়্গ, অন্য হাতে নরমুণ্ড; আবার অপর দুই হাতে বরমুদ্রা ও
অভয়মুদ্রা। সংহার ও আশ্রয় — এই বৈপরীত্যের এমন সংহতি অন্য দেবীর ক্ষেত্রে বিরল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালী-রূপের এই দ্বৈততাকে গানে ব্যক্ত করেছেন —
“ডান হাতে তোর খড়্গ জ্বলে,
বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ,
দুই নয়নে স্নেহের হাসি,
ললাটনেত্র আগুনবরণ।”
এই চিত্রে কালী একই সঙ্গে সংহারিণী ও করুণাময়ী জননী। তাঁর মুক্তকেশ
অনন্তের প্রতীক; তাঁর তৃতীয় নয়ন জাগ্রত চেতনার দীপ্তি। তিনি বিভীষিকা নন, বরং
বিভীষিকার মধ্য দিয়ে সত্যের উন্মোচন।
‘কালী’
শব্দের উৎস ‘কাল’। মহানির্বাণ তন্ত্র-এ বলা হয়েছে — যিনি কালকে ‘কলন’
অর্থাৎ গ্রাস করেন, তিনিই কালী। অর্থাৎ তিনি কালেরও অতীত শক্তি। যে ‘কাল’ সমস্ত সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ
করে, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে শাসন করে, সেই
কালকেও নিয়ন্ত্রণ করেন কালী। এমনকী দেবতাও কালের বিধান মান্য করেন। কালীর
পদতলে মহাদেবের শায়িত রূপ এই সত্যেরই প্রতীক। মহাদেব এখানে শব; চৈতন্যহীন।
চৈতন্য যখন কালের স্পর্শে স্তব্ধ, তখন কালীই তার জাগরণশক্তি।
‘কাল’
মানে সময়। সময় মানুষের অনিবার্য নিয়ন্তা। সময়ের প্রবাহে যৌবন ক্ষীণ হয়, শরীর
জীর্ণ হয়, স্মৃতি
ফিকে হয়ে আসে। আমরা বলি — ‘সময় কাটাচ্ছি’ কিংবা ‘কিলিং টাইম’। কিন্তু প্রকৃত সত্য তার বিপরীত — সময়ই আমাদের ক্ষয় করে, আমাদের
জীবনশক্তিকে নীরবে গ্রাস করে।
‘কাল’
শব্দের আর এক অর্থ মৃত্যু। সংস্কৃত ভাষায় ‘কাল’ মানে যেমন সময়, তেমনি
মৃত্যু। এই দ্বৈত অর্থ গভীর দার্শনিক সত্যকে ধারণ করে — সময় ও মৃত্যু আসলে একই
ধারার দুই প্রকাশ। সময়ের ধারাই মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়; মৃত্যু
সময়েরই চূড়ান্ত পরিণতি। ভাষার এই অন্তর্নিহিত সমার্থকতা ভারতীয় চেতনার আধ্যাত্মিক
অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক।
এই প্রেক্ষাপটে কালী কেবল সময়ের দেবী নন; তিনি
মৃত্যুরও অধিষ্ঠাত্রী। তাঁর খড়্গ অহংকার ও মায়ার সংহারক। নরমুণ্ড মানব-অহংকারের
প্রতীক, যা
একদিন কালের আঘাতে পতিত হয়। গলার মুন্ডমালা অসংখ্য জন্ম-মৃত্যুর ধারাবাহিকতার
স্মারক। আমরা প্রত্যেকেই একদিন সেই মালার অঙ্গ হব — এই কঠিন সত্যকে স্মরণ করিয়ে
দেন তিনি।
তবু কালী কেবল সংহারিণী নন। তাঁর অভয়মুদ্রা আশ্বাস দেয় — ভয় করো না।
বরমুদ্রা ঘোষণা করে — মৃত্যু শেষ নয়, রূপান্তর। কালীসাধনা তাই মৃত্যুভয়
অতিক্রমের সাধনা। যখন সাধক উপলব্ধি করেন যে সময় ও মৃত্যু সৃষ্টিচক্রের স্বাভাবিক
পর্ব, তখন
তার চিত্তে ভয় লুপ্ত হয়, জন্ম নেয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
কালী সময়ের তিন পর্ব — অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ
— অতিক্রম করে অনন্তে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর ত্রিনয়ন কালের ধারাকে ধারণ করে, আবার
তাকে অতিক্রমও করে। তিনি কালের মধ্যে প্রকাশিত, কিন্তু কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। তাই
তিনি মুক্তকেশী; তাই তিনি দিগবসনা — সীমাহীনতার প্রতীক।
কালীসাধনার প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই — এটি কেবল পূজা বা আচার নয়; এটি অস্তিত্বের গভীর অনুসন্ধান। সময়ের অনিবার্যতা স্বীকার করে, মৃত্যুর সত্যকে মেনে নিয়ে, তার ঊর্ধ্বে চেতনার উত্তরণই কালীসাধনার মর্ম। কালের কারাগার ভেঙে কালহীন চেতনায় প্রতিষ্ঠা — এই সাধনাই মুক্তির পথ।
কার্তিকের অমানিশায় তাই প্রার্থনা —
হে
অনন্ত আকাশবসনা দেবী, তোমার ত্রিনয়নের দীপ্তিতে প্রজ্বলিত করো আমাদের অন্তর।
হে কালাতীত মহামায়া, আমাদেরকে কালের গ্রাস থেকে মুক্ত করে
অনন্ত চেতনার পথে পরিচালিত করো। ভয় লয়
হোক, অহং লয়
হোক, সময়ের
বন্ধন লয় হোক — প্রতিষ্ঠা পাক চিরন্তন মুক্তি।▣
